শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন




চার মহারথীর সামনে তানজিদ তামিমের ব্যাটে ইতিহাস

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৪২ pm
Bangladesh Cricket board bcb বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি টেস্ট ক্রিকেট Test cricket bcb টেস্ট দল Cricket-Bangladesh afg bangladesh Cricket-Bangladesh
file pic

নাথান লায়নের বলটা লং অফে ঠেলে দিয়েই বুঝে গিয়েছিলেন, অপেক্ষার পালা শেষ। সেঞ্চুরি যে হয়ে গেছে! রান নেওয়ার মাঝপথেই তাই লাফ দিলেন। এরপর ক্রিজ পেরিয়ে হেলমেট আর ব্যাট দুই হাতে মেলে ধরলেন। মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। হাসবেনইবা না কেন!

মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়েছেন তানজিদ হাসান তামিম। শুক্রবার ডারউইনে প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড, মিচেল স্টার্ক ও নাথান লায়নকে নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন তিনি।

টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা এমনিতেই বড় ব্যাপার। কিন্তু তানজিদের এই সেঞ্চুরির গল্পটা একটু আলাদা। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট, দেশের বাইরে প্রথম। তার ওপর প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। যে দলের মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ, সেই দলের বিপক্ষেই সেঞ্চুরি করে ইতিহাস গড়লেন এই তরুণ ওপেনার।

গত মে মাসে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল তানজিদের। তবে তার আগেই ৪০টি ওয়ানডে ও ৫৩টি টি-টোয়েন্টি খেলে ফেলেছেন। তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পরিচিতি নতুন নয়। টি-টোয়েন্টিতে ৫৩ ম্যাচে ১৩টি ফিফটি আছে। ওয়ানডেতে নয়টি ফিফটির সঙ্গে একটি সেঞ্চুরিও। টেস্টে নিজের সামর্থ্যের সবচেয়ে বড় পরিচয়টা দিলেন দ্বিতীয় ম্যাচেই।

আর সেই পরিচয় দেওয়ার মঞ্চটাও ছিল কঠিন। মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজেলউড, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়ন-চারজনের নামের পাশেই লেখা অসংখ্য সাফল্যের গল্প। একসঙ্গে তাদের টেস্ট উইকেট ১,৬১০-এর বেশি। এই চারজন ৩৫ টেস্টে একসঙ্গে নিয়েছেন ৫৬৭ উইকেট। এমন বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ব্যাট করতে নামার আগে অভিজ্ঞ ব্যাটারও বাড়তি সতর্ক থাকেন। সেখানে তানজিদের টেস্ট অভিজ্ঞতা মাত্র একটি ম্যাচ!

কিন্তু ব্যাটিংয়ে সেটা বোঝার উপায় ছিল না। আগের দিন অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে শেষ করে বাংলাদেশ দিন শেষ করেছিল ১ উইকেটে ৯৬ রানে। অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ভালো অবস্থানে থাকলেও কাজটা শেষ হয়নি। অস্ট্রেলিয়া চেয়েছিল দ্রুত উইকেট তুলে ম্যাচে ফিরতে। গতি, বাউন্স, সুইং-সবকিছুর সঙ্গে ছিল ফিল্ডারদের কথার লড়াইও।

তানজিদকে অবশ্য সেসব খুব একটা বিচলিত করতে পারেনি। বরং অস্ট্রেলিয়ার বোলিং যতটা কঠিন হওয়ার কথা ছিল, তানজিদের ব্যাটিং ততটাই সহজ মনে হচ্ছিল। অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়েছেন, সুযোগ পেলেই ড্রাইভ খেলেছেন। পেছনের পায়ে ভর করে পাঞ্চ করেছেন। বিউ ওয়েবস্টারকে ডাউন দ্য উইকেটে উঠে মারা ছক্কাটিও ছিল তার আত্মবিশ্বাসের বড় প্রমাণ। দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এর আগে মাত্র একটি টেস্ট খেলেছেন এই ব্যাটার।

অবশ্য ইনিংসের শুরুতে ভাগ্যও একবার পাশে দাঁড়িয়েছিল। ব্যক্তিগত ২ রানে স্টিভ স্মিথের হাতে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান তানজিদ। সেই জীবনটা তিনি কতটা মূল্যবান করে তুলতে পারেন, তখনও হয়তো বোঝা যাচ্ছিল না। পরে অবশ্য সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেছেন।

মুমিনুল হককে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ১০২ রানের জুটি গড়েন তানজিদ। মুমিনুল যখন ফিরে যান, ফিফটি থেকে মাত্র এক রান দূরে ছিলেন। আর মাত্র একটু সময় একসঙ্গে থাকতে পারলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় উইকেটে সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ডটাও নতুন করে লেখা হয়ে যেত। হলো না। ২০০৩ সালে কেয়ার্নসে হাবিবুল বাশার ও হান্নান সরকারের ১০৮ রানের জুটিই রয়ে গেল শীর্ষে।

তবে তানজিদ থামেননি। তার প্রথম পঞ্চাশ আসে ১০২ বলে। তখন চার ছিল ৫টি। এরপর যেন ব্যাটিংয়ের গতি আরও বাড়িয়ে দেন। পরের পঞ্চাশ এসেছে ৮৬ বলে। এই অংশে তিনটি চার ও একটি ছক্কা মেরেছেন তিনি। অর্থাৎ শুরুতে যে ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, পরে সেটিই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসনে।

আর তারপর এল সেই মুহূর্ত। নাথান লায়নের বল লং অফে ঠেলে দিয়ে তানজিদ বুঝে গেলেন, তিন অঙ্কে পৌঁছে গেছেন। রান শেষ করার আগেই লাফ। এরপর হেলমেট আর ব্যাট দুই হাতে ছড়িয়ে দিয়ে উদ্‌যাপন। সতীর্থরা ছুটে এলেন। গ্যালারিতে অস্ট্রেলিয়ান দর্শকদের করতালি। দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন তারা বাংলাদেশের তরুণ ব্যাটারকে।

১৯৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তানজিদ। যদিও তিন অঙ্কে পৌঁছানোর পর বেশিক্ষণ থাকা হয়নি। ১০১ রানেই থামতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তার আগেই যা করার, করে ফেলেছেন। শুধু রানের সংখ্যা দিয়ে এই ইনিংস মাপা যাবে না। এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

শাহরিয়ার নাফীসের পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে সেঞ্চুরি করা বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটারও তানজিদ। তবে তার কীর্তির সবচেয়ে বড় পরিচয়-অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান তিনি। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান কিংবা মুশফিকুর রহিমের মতো দেশের বড় বড় ব্যাটাররাও পারেননি। যা পারলেন তানজিদ তামিম।

তানজিদের এই ইনিংসের সৌন্দর্য শুধু রেকর্ডে নয়, কীভাবে রেকর্ডটা এসেছে, সেখানেও। শুরুতে জীবন পেয়েছেন, তারপর পরিস্থিতি বুঝেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের গতি-বাউন্স সামলেছেন। প্রয়োজনের সময় আক্রমণ করেছেন, আবার ছাড়ার বল ছেড়েছেন। প্রতিপক্ষের চাপকে নিজের ওপর চেপে বসতে দেননি।

মুশফিকুর রহিম কিংবা মুমিনুল হকের মতো ক্রিকেটারদের টেস্ট ক্যারিয়ারের অনেকটা সময় পার করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলার সুযোগ এসেছে। তানজিদের গল্পটা সেখানে একেবারেই আলাদা। দ্বিতীয় টেস্টেই বিদেশের মাটিতে প্রথমবার। আর সেই প্রথমবারেই এমন এক কীর্তি, যা বাংলাদেশের ক্রিকেটে আর কারও নেই।

হয়তো এই কারণেই ইনিংসটাকে শুধু ‘সেঞ্চুরি’ বলে শেষ করা যায় না। কিছু ইনিংস স্কোরকার্ডে থাকে। কিছু ইনিংস রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নেয়। আর কিছু ইনিংসের সঙ্গে একটা সময়, একটা প্রজন্ম, একটা দেশের ক্রিকেটের স্মৃতি জড়িয়ে যায়। তানজিদের ডারউইন ইনিংসটা সম্ভবত সেই তালিকাতেই থাকবে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD