দেশজুড়ে হাম এখন চলমান এক আতঙ্কের নাম। মহামারি আকারে ছোঁয়াচে এই ভাইরাসজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার। ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। সরকারি হিসাবে হামে এখন পর্যন্ত প্রাণ গেছে ৯১৮ শিশুর। আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৬২ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবারও মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর এবং আক্রান্ত হয়েছে এক হাজারের বেশি।
দেশে বহু বছর নিয়ন্ত্রণে থাকার পর হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে জনমনে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। সন্তানদের চিকিৎসায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন অভিভাবকরা। নিয়মিত টিকাদান ও জরুরি টিকা কর্মসূচির পরও কেন সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না—তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। তবে এত বিপুলসংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যুর পেছনে সরকারের সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের ঘাটতিকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার মূলত টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু শুধু টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতার পরও পরিস্থিতিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে তৈরি সংকটে টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়া, ঝুঁকির তথ্য সময়মতো বিশ্লেষণ না করা, পুষ্টির ঘাটতি, রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত ও আইসোলেশনে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে টিকার আওতায় এনে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করা জরুরি। দীর্ঘদিন টিকাদানের কভারেজে ঘাটতি থাকায় সুরক্ষা বলয় দুর্বল হয়েছে। তাই হাম নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা, রোগ নজরদারি জোরদার, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও হাসপাতালগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ শিশুর। বাকি ৮১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম উপসর্গে। সন্দেহজনক হাম উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে এক লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ শিশু। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ৯৮৯ জন। এ সময়ে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ২৮৯ শিশু। হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতালের ছাড়পত্র পেয়েছে এক লাখ ২১ হাজার ৮৮০ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে, ৪২৩ জনের। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে ৩৬১ জন মারা গেছে । যার শতকরা হার ৪৬ দশমিক এক শতাংশ। এর পরই আছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১৩৮ জন। এছাড়া রাজশাহীতে ৯৫, ময়মনসিংহে ৭৬, চট্টগ্রামে ৭৩, বরিশালে ৬৭, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১৪ জন মারা গেছে। আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এ বিভাগে হাম ও উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৯৫ শিশু, যার শতকরা হার ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিশ্লেষণ বলছে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশই কোনো টিকা নেয়নি। মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম এবং ৩১ শতাংশের ছয় থেকে ৯ মাস। এক ডোজ টিকা নেওয়া ৭.৯ শতাংশ এবং দুই ডোজ নেওয়া ২.১৯ শতাংশ শিশুও মারা গেছে। আক্রান্তদের ৭২ শতাংশের বয়স ৫ বছরের কম, আর ১১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি।
চলতি বছরের মার্চে কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে পরে তা ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় টিকাদান শুরু হয়। এরপর গত ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে হাম-রুবেলা টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু হয়, যা শেষ হয় গত ২০ মে। এ পর্যায়ে ৯ মাসের কম বয়সিরাও আক্রান্ত হওয়ায় ৬ মাস বয়সি শিশুদেরও ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। তবে এরপর ৬ মাসের কম বয়সি শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে এমআর টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু গত জুনে ‘ভিটামিন এ’ জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় জানা যায়, ওই বয়সি শিশু আছে ২ কোটি ২৬ লাখ। সে হিসাবে প্রায় ৪১ লাখ শিশু টিকার ক্যাম্পেইন থেকে বাদ পড়ে। অর্থাৎ, এসব শিশু টিকার আওতায় আসেনি। এর অর্থ হলো, এসব শিশু এখনো হামের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে গত ১৪ জুলাই ইপিআইয়ের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশই কোনো এমআর টিকা নেয়নি।
টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হামে এমন মৃত্যু অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন ব্যবস্থা না করা এবং তৃতীয় পর্যায় ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থার ঘাটতিও সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। ফলে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরাও হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সরকারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতিসহ বেশ কিছু ভুলের কারণেই হামে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো। যখন দেশজুড়ে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এটিকে মহামারি বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করা সরকারের এক ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম প্রতিরোধে ও প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে একটি দেশের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকাদান নিশ্চিত করতে হয়। এর নিচে নামলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামগ্রিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। টিকাদানের কাভারেজ নিশ্চিত করা গেলেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, হাম সংক্রমণ ঠেকাতে শিশুরা মায়েদের থেকে কতটা হামের অ্যান্টিবডি পাচ্ছে, কোন বয়স থেকে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া দরকার, পাঁচ বছরের বেশি বয়সিদের টিকা দেওয়া দরকার কি না—এসব নিয়ে একটি জাতীয় অবস্থানপত্র তৈরি হওয়া জরুরি। এছাড়াও শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এ জন্য এলাকাভিত্তিক শিশুর সংখ্যা, প্রয়োজনীয় টিকার পরিমাণ এবং টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে পরিকল্পনা করতে হবে।
এ বিষয়ে টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, দেশে টিকা প্রদানের হার কমার অন্যতম কারণ ছিল স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি। এছাড়া ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও জটিলতা তৈরি হয়। এখন আবার টিকা দেওয়ার পরও অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এর কারণও আছে—যেমন, সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ ২ কোটি ২৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। কিন্তু টিকার আওতায় এসেছে ৮১ শতাংশ শিশু। বাদ পড়েছে প্রায় ৪২ লাখ শিশু। যার ফলে অনেক শিশুই টিকাবঞ্চিত রয়ে গেছে। আবার টিকা দেওয়ার পর শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। তাদের শরীরে কতটুকু অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, তা নির্ণয় করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া ৫ থেকে ১০ বছর বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা এবং টিকার যাতে ঘাটতি না হয়, তার দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। আমার দেশ