মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ন




নেপালে বন্যা

‘আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু আমার ভাই-বোন পারেনি’

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯:৫০ am

নেপালের রসুয়া ও নুয়াকোটে ভয়াবহ বন্যার পর শত শত শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে। কেউ হারিয়েছে ভাই-বোন, কেউ বাবা-মা, আবার কেউ চোখের সামনে স্বজনকে ভেসে যেতে দেখেছে। স্কুল, ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবন—সবকিছুই যেন এক মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছে ভয়াবহ বন্যা।

১৬ বছর বয়সি সামির তামাং সেদিন স্কুলে পৌঁছানোর আগেই দেখেছিল, ভোতেকোশি নদী ভয়ংকর স্রোতে পরিণত হয়েছে। জীবন বাঁচাতে সে পাশের একটি পাহাড়ে উঠে যায়। কিন্তু বাড়িতে ছিল তার দুই ছোট বোন—১৩ বছরের প্রিয়া ও ৭ বছরের পার্বতী। বুধবারের ভয়াবহ স্রোত তাদের গ্রাম ভাসিয়ে নেওয়ার পর থেকে দুই বোনের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রসুয়ার লাহারেপাওয়ার শিবালয়া বেসিক স্কুলের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামির বলছিল, আমি আর বুঝতে পারছি না কী করব। আমার দুই বোনই ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। এক মুহূর্তেই বন্যা তাদের আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।

সামিরের পরিবারও বন্যার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। তার বাবা সূর্য কোনোভাবে বেঁচে গেলেও মা ছেসাং বর্তমানে কুয়েতে কর্মরত।

২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর রসুয়া ও নুয়াকোটের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শত শত শিশুর একজন সামির।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে ২৫০ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যে ২৩০ শিক্ষার্থীর ২১৩ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না এবং ১৭ জন বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া নিখোঁজ ১৯ শিক্ষকের মধ্যে ১০ জনের ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বন্যায় রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের অন্তত ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে নুয়াকোটে ৮টি, রসুয়ায় ৭টি এবং ধাদিংয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

নেপালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা বীর বাহাদুর ধামি বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী দল এখনো কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। ফলে নিখোঁজ ও হতাহতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।

ভাই-বোনের অপেক্ষায় শিশুরা

১৪ বছরের আকাশ তামাংয়ের কাছেও বন্যার স্মৃতি এখন এক দুঃস্বপ্ন। সে সকালে উত্তরগয়া পাবলিক স্কুলে পৌঁছানোর পর ত্রিশূলী নদীর দিক থেকে ভয়ংকর শব্দ শুনতে পায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি স্কুল প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে সবাই দৌড়ে জঙ্গলের দিকে ছুটে যায়।

আকাশ জানায়, আমরা যত দ্রুত সম্ভব জঙ্গলের দিকে দৌড়েছিলাম। না হলে হয়তো বাঁচতে পারতাম না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বন্যা আমার স্কুলটাকে গিলে ফেলে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা একটি বাসও বন্যার পানিতে আটকা পড়ে।

সেদিন সকালে আকাশ তার দুই ছোট ভাই-বোন—৮ বছরের আশ্বিন ও ১১ বছরের অনিশার জন্য খাবার তৈরি করে তাদের নুয়াকোটের রামচন্দ্র বেসিক স্কুলে পাঠিয়েছিল। এরপর থেকে তাদের আর দেখা যায়নি।

কান্না মুছতে মুছতে আকাশ বলে, ‘আমি বেঁচে গেছি, কিন্তু আমার ভাই-বোন পারেনি।’

অনিশা তৃতীয় শ্রেণিতে এবং আশ্বিন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। তাদের মা কারসাং দুবাইয়ে এবং বাবা সানুকাঞ্চা মালয়েশিয়ায় কাজ করেন। বাবা-মায়ের পাঠানো টাকায় তারা বেত্রাবতীতে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত।

আকাশ জানায়, ‘নদী আমার ভাই-বোনকে কোথায় নিয়ে গেছে, আমি জানি না।’

নিখোঁজ ভাইকে খুঁজছে ১৫ বছরের নিরাজন

১৫ বছরের নিরাজন তামাংও তার ছোট ভাই আবিরালকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ১২ বছরের আবিরাল ছিল নীলকণ্ঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলে যাওয়ার পথে সে ভয়াবহ স্রোতের মধ্যে পড়ে নিখোঁজ হয়।

নিরাজন জানায়, আমি তখন স্কুলে পৌঁছে গিয়েছিলাম। আমার ভাই স্কুলে যাওয়ার সময় বন্যার পানিতে আটকা পড়ে। আমি তাকে খুব মিস করি। এখন মনে হচ্ছে, হয়তো আমরা আর কোনোদিন তাকে খুঁজে পাব না।

একাই হয়ে গেল ১২ বছরের আনজু

কালিকা গ্রামীণ পৌরসভার কালিকাস্তানে ১২ বছরের আনজু তামাং বন্যায় হারিয়েছে তার মা, বড় ভাই, ভাবি, খালা, মামা ও এক বছরের এক চাচাতো ভাইকে। পাঁচ বছর আগেই বাবাকে হারানো আনজু এখন সম্পূর্ণ অসহায়।

বাড়িঘর হারিয়ে বর্তমানে আত্মীয়দের সঙ্গে শিবালয়া বেসিক স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটছে তার।

সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ১৭ হাজার শিশু

ইউনিসেফের নেপাল প্রতিনিধি অ্যালিস আকুঙ্গা জানিয়েছেন, ত্রিশূলী ও ভোতেকোশি নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ এই দুর্যোগে আনুমানিক ১৭ হাজার শিশু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া শিশুরা এখন রোগ, অপুষ্টি, নির্যাতন ও মানসিক আঘাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের জন্য অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষা উপকরণ এবং মানসিক সহায়তা দ্রুত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বন্যার পর শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নেপালের নারী, শিশু ও জ্যেষ্ঠ নাগরিক মন্ত্রণালয় সতর্ক করে জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত শিশুদের বেআইনিভাবে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া বা কারও জিম্মায় দেওয়ার চেষ্টা ঠেকাতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও মুখপাত্র চক্র বাহাদুর বুধা বলেন, রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের মতো দুর্যোগকবলিত এলাকায় শিশুদের চলাচলের ওপর স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর নজর রাখতে হবে।

তিনি জানান, বাবা-মা বা ঘরবাড়ি হারানো কোনো শিশুকে স্থানীয় শিশু কল্যাণ কর্মকর্তার সুপারিশ এবং জাতীয় শিশু অধিকার কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্যত্র নিয়ে যেতে পারবে না।

আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও চিকিৎসার সংকট

ত্রাণ কার্যক্রমের শুরুতে শিশুদের অনেক জায়গায় ইনস্ট্যান্ট নুডলসসহ দ্রুত প্রস্তুত খাবার দেওয়া হলেও এখন তাদের পুষ্টিকর খাবারের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো।

নেপাল রেড ক্রস সোসাইটির জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্রের সমন্বয়ক শের বাহাদুর কার্কি বলেন, ‘শিশুদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি। শুধু ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো খাবার দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। রোগ প্রতিরোধে তাদের প্রোটিনসমৃদ্ধ ও সুষম খাবার দরকার।’

নেপাল রেড ক্রসের কর্মীরা নুয়াকোটের তিনটি প্রধান আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করছেন। তারা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে গদি, কম্বল, শুকনো খাবার ও পোশাক বিতরণ করছেন।

এদিকে ইউনিসেফ শিশুদের মানসিক চাপ ও ভয় কাটিয়ে উঠতে বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা দল পাঠিয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করা, একা হয়ে যাওয়া শিশুদের তালিকাভুক্ত করা এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের কাজও চলছে।

নদীর শব্দেই আতঙ্কিত ১৩ বছরের নির্মল

১৩ বছরের নির্মল ঘালে এখনো সেই ভয়াবহ মুহূর্ত ভুলতে পারেনি। স্কুলে যাওয়ার পথে সে দেখেছিল তার দাদা-দাদি মিংমার ও লেনজম নদীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এরপর খালি পায়ে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে প্রাণ বাঁচায় সে।

নির্মল বলে, ‘বন্যা যখন আসে, শব্দটা ছিল ভয়ংকর। মনে হচ্ছিল সেখানেই মারা যাব। জুতা খুলে জঙ্গলের দিকে দৌড়েছিলাম। আমার অনেক সহপাঠী ভেসে গেছে।’

এখন নদীর শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে নির্মল। সে বলছে, ‘আমি আর স্কুলে যেতে চাই না। আমার পরার মতো অতিরিক্ত কাপড়ও নেই।’

নিখোঁজদের তালিকা চূড়ান্ত করাই কঠিন

উদ্ধার অভিযান এখনো নদীর তীরবর্তী এলাকায় চলছে। ফলে নিখোঁজ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের জাতীয় শিশু অধিকার কাউন্সিল জানিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন ও ওয়ার্ড কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নিখোঁজ শিশুদের তথ্য যাচাই, জীবিতদের খুঁজে বের করা এবং বাস্তুচ্যুত শিশুদের সরকারি সুরক্ষা দেওয়ার কাজ চলছে।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে বহু শিশু শুধু ঘরবাড়িই হারায়নি—হারিয়েছে বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বজন, স্কুল এবং তাদের পরিচিত পুরো জীবন। এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টিকর খাবার, শিক্ষা এবং মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ।

তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD