গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েলি হামলায় গড়ে প্রতি ৯০ মিনিটে একজন ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ইসলামিক রিলিফ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, গত এক বছরে অন্তত ১ হাজার ৪৫৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২০ জন শিশু রয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় একজন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৪৭১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১৮৯ জন আহত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছেন চারজন এবং আহত হয়েছেন ২৮ জন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭৪ হাজার ২৫৪ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হন। একই দিন মধ্য গাজার খান ইউনিসে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা।
অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনের পশ্চিমে ইয়ামুন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সময় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট।
গাজার ৬৫ শতাংশ এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা
ইসলামিক রিলিফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখাকে কাজে লাগিয়ে গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ২১ লাখ মানুষের এই ভূখণ্ডের বাকি ৩৫ শতাংশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হচ্ছে।
মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে
ইসলামিক রিলিফের অভিযোগ, ইসরায়েল এখনও গাজায় আশ্রয় তৈরির সামগ্রী, জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এতে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
গাজায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার জন্য বিশ্বনেতাদের আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক রিলিফ। সংস্থাটির মতে, কেবল কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেই চলবে না; মানুষের প্রাণহানি বন্ধ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রাণ গেল আরও ৭ ফিলিস্তিনির
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। এসব হামলার ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২ জনেরও বেশি মানুষ।
বৃহস্পতিবার গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-সুদানিয়া, রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এবং খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এসব অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনই প্রাণ হারিয়েছেন গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকায়।
চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, গাজা সিটির উত্তর-পশ্চিমে আল-তাওয়াম এলাকার মিসরীয় ক্যাম্পে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া একটি তাঁবুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। ওই হামলায় আহত মোহাম্মদ রাজাব ওয়ারশ আগা পরে মারা যান।
ইসরায়েলি বাধায় ২০২৭ রোগীর মৃত্যু
উন্নত চিকিৎসার জন্য ইসরায়েলি বাধায় গাজা ছাড়তে না পারায় ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ সীমান্ত পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। গত বুধবার এই তথ্য জানিয়েছে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী এখনও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম আল আরব আলুজাদিদ জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৭ জন রোগী চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় থেকে মারা গেছেন। এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলটির প্রায় ২১ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।