মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২১ অপরাহ্ন




নরেন্দ্র মোদির ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৩:৫৭ pm
Shri Narendra Modi Narendra Damodardas Modi Prime Minister of India ভারত ভারতের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি মোদী नरेंद्र दामोदर दास मोदी নরেন্দ্র মোদি
file pic

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় থাকার ত্রয়োদশ বছরে এসে একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একদিকে তরুণদের প্রতিবাদী আন্দোলন থামার লক্ষণ নেই, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই টানাপড়েনপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর পাশাপাশি সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও ভারতীয় রুপির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এসব সংকট একসঙ্গে মোদি সরকারের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

গত এক দশকের বেশির ভাগ সময় মোদিকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য মনে করা হলেও বর্তমানে একাধিক সমস্যা তার সরকারের জন্য অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, মোদি কি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি? মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত একটি তরুণ আন্দোলন শুরুতে কৌতুক হিসেবে আবির্ভূত হলেও পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আলোচনায় আসে। এবার আন্দোলনকারীরা ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লক্ষ্য করে প্রতিবাদ কর্মসূচি জোরদার করছেন।

গত সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। ভোটার তালিকা পর্যালোচনার সাম্প্রতিক উদ্যোগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ এসব পদক্ষেপ নেয়।

গত বছর শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ পড়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থান পরিবর্তনকারী এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

যদিও সিজেপি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়নি এবং মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় পেয়েছে, তবু তরুণদের এই আন্দোলন ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

ফিচ সলিউশনসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিএমআই গত সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে বলেছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে ভারতে দ্বিতীয় দফার ‘ককরোচ’ আন্দোলন আরও জোরদার হতে পারে। জুলাইয়ের আন্দোলনের তুলনায় এবারের কর্মসূচি বড় আকার ধারণ করার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাও রয়েছে।

সংস্থাটির মতে, সিজেপির সাংগঠনিক শক্তি বেড়েছে, তাদের ক্ষোভের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে এবং অন্যান্য বিরোধী আন্দোলনের সমর্থনও তারা পাচ্ছে। তবে বড় শহরগুলোর বাইরে আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাত্রা এক রকম নয়। ফলে দেশজুড়ে আন্দোলনটির ব্যাপক বিস্তার ঘটবে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে মোদি সরকার। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা একটি বাণিজ্য চুক্তি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে।

আলোচনা এগোচ্ছে না কেন, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই সুনির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। তবে এর পেছনে একটি প্রস্তাবিত মার্কিন বিলকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিলটি পাস হলে ভারত ও চীনের মতো যেসব দেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রাশিয়ার তেল কেনে, সেসব দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পাবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, মোদি সরকারের অবস্থান আপসের মনোভাব থেকে আরও সংঘাতমুখী হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক হিসাব কাজ করতে পারে। ভারতের জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে বলেও মনে করেন।

কুগেলম্যান বলেন, ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ, পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতকে নিয়ে সমালোচনাসহ বিভিন্ন কারণে দেশটির জনগণের একটি বড় অংশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ।

যুক্তরাষ্ট্র ‘পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন’ কর্মসূচি সীমিত করার পদক্ষেপও নিয়েছে। একসময় ইনফোসিস ও টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেসের (টিসিএস) মতো ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মসূচিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত পাঁচ বছরে এসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে। ফলে এ পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে ভারতীয় রুপির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তেলের উচ্চমূল্য এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় সম্পদ বিক্রির কারণে মুদ্রাটির ওপর আগে থেকেই চাপ রয়েছে।

ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এবং দেশটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিগুলোর একটি। তা সত্ত্বেও, তেলের উচ্চমূল্যের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড পরিমাণ ভারতীয় সম্পদ বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগের সুযোগের অভাবও ভারতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়েছে।

এসব কারণে রুপির মানের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হয়েছে। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ভারতে প্রায়ই স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। সপ্তাহের শুরুতে সুদের হার বাড়ানোর পরও রুপির দরপতন ঠেকানো যায়নি। ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সপ্তাহান্তে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

মুম্বাইভিত্তিক সিস্টেমেটিক্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ধনঞ্জয় সিনহা বলেন, বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনা ভারতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও রুপির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক মূলধন প্রত্যাহারও রুপির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের দুর্বল অবস্থানে মনে করার কারণে ভারত হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি ওয়াশিংটনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে—এমন ধারণা এড়াতেও তারা আগ্রহী।

সোমবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া নতুন তথ্য-সিরিজের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবারগুলোর মধ্যেও ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আরও ৭৫ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদের হার বাড়িয়েছিল রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

রয়টার্স




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD