আইন প্রণয়ন করাটা মূল দায়িত্ব হলেও আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয় মার্কিন কংগ্রেসকে। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর নির্ধারণ, নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করতে হয় তাদের।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, কংগ্রেস গঠিত হয়েছে দুটি কক্ষ নিয়ে—প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সেনেট।
দুটি কক্ষের সদস্যসংখ্যা, মেয়াদ, প্রতিনিধিত্বের ধরন ও কাজের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। তবে কোনো বিলকে আইনে পরিণত করতে সাধারণত দুই কক্ষেরই সম্মতি প্রয়োজন।
কংগ্রেসের গঠন: দুই কক্ষে ৫৩৫ সদস্য
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মোট ৫৩৫ জন ভোটাধিকারসম্পন্ন সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ৪৩৫ জন এবং সেনেটের সদস্য ১০০ জন।
প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আসনসংখ্যা নির্ধারিত হয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে। অর্থাৎ, যে অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা বেশি, সেখানে প্রতিনিধি পরিষদে আসনও তুলনামূলক বেশি। সদস্যরা নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যের নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন।
অন্যদিকে, প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সেনেটর নির্বাচিত হন। অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা যতই হোক, সেনেটে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সব অঙ্গরাজ্যের সমান অধিকার রয়েছে। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো জনবহুল অঙ্গরাজ্য এবং তুলনামূলক কম জনসংখ্যার অঙ্গরাজ্য—উভয়ই দুজন করে সেনেটর পাঠায়।
সদস্য নির্বাচনের যোগ্যতা ও মেয়াদ
প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হতে হলে প্রার্থীকে কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী এবং অন্তত সাত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হবে। নির্বাচনের সময় সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা হওয়াও বাধ্যতামূলক।
সেনেটর হওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত আরও বেশি। প্রার্থীকে কমপক্ষে ৩০ বছর বয়সী এবং অন্তত নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে হয়। একইভাবে নির্বাচনের সময় সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা হতে হবে।
দুই কক্ষের সদস্যদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদেও পার্থক্য রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ফলে প্রতি দুই বছর পরপর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে নির্বাচন হয়।
অন্যদিকে, সেনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর অন্তর সেনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সেনেটের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং পুরো কক্ষ একসঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি কমে।
ক্ষমতা ও দায়িত্বে দুই কক্ষের পার্থক্য
প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন হলেও তাদের কিছু বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো রাজস্ব বা করসংক্রান্ত বিল উত্থাপন করা। অর্থাৎ, নতুন কর আরোপ বা রাজস্ব সংগ্রহের বিষয়ে অর্থবিল সাধারণত এই কক্ষ থেকেই শুরু হয়। এ ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের অভিযোগ আনার ক্ষমতা রয়েছে প্রতিনিধি পরিষদের। তবে অভিযোগ আনা মানেই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়।
অন্যদিকে, সেনেটের রয়েছে অভিশংসনের বিচার পরিচালনার ক্ষমতা। প্রতিনিধি পরিষদ অভিযোগ আনলে সেনেট বিচার করে এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে পদ থেকে অপসারণ করা যায়।
এছাড়া প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত ও ফেডারেল বিচারপতিদের নিয়োগে সেনেটের সম্মতি নিতে হয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সেনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থাৎ, প্রতিনিধি পরিষদ জনগণের নির্বাচনি এলাকার প্রতিনিধিত্বকে গুরুত্ব দেয়, আর সেনেট অঙ্গরাজ্যগুলোর সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। দুই কক্ষের এই আলাদা আলাদা ক্ষমতা আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
আইন কীভাবে তৈরি ও পাস হয়?
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রস্তাবিত আইনকে বিল বলা হয়। সাধারণত কংগ্রেসের কোনো সদস্য বিল উত্থাপন করেন। এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটি বিলটির প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য প্রভাব ও বিভিন্ন দিক যাচাই করে দেখে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য শুনে বিলের বিভিন্ন ধারা সংশোধন করা হয়।
কমিটির পর্যালোচনা শেষে বিলটি কক্ষের আলোচনার জন্য পাঠানো হতে পারে। সেখানে সদস্যরা বিতর্ক করেন, সংশোধনী প্রস্তাব দেন এবং ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতিনিধি পরিষদে বিল পাস হওয়ার পর সেটি সেনেটে পাঠানো হয়। সেনেটেও একইভাবে আলোচনা, সংশোধন ও ভোটাভুটি হয়। তবে দুটি কক্ষে পাস হওয়া বিলের ভাষা ও বিষয়বস্তু অভিন্ন হতে হবে। এক কক্ষ কোনো পরিবর্তন আনলে অন্য কক্ষকেও সেই পরিবর্তনে সম্মতি দিতে হয়। মতপার্থক্য থাকলে দুই কক্ষের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে একই সংস্করণ চূড়ান্ত করা হয়।
দুই কক্ষের সম্মতি পাওয়ার পর বিলটি প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হয়। প্রেসিডেন্ট সই করলে সেটি আইনে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্টের আপত্তি জানানোর ক্ষমতাও আছে।
প্রেসিডেন্টের কাছে বিল পৌঁছানোর পর সাধারণত ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তিনি কোনো পদক্ষেপ না নিলে এবং কংগ্রেস অধিবেশনে থাকলে বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনে পরিণত হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের কাজের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য
দুই কক্ষের কার্যপ্রণালিতেও বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্ব আইন আলোচনার সময়সূচি, বিতর্কের নিয়ম এবং কোন বিল ভোটে উঠবে, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। এখানে বিতর্কের সময়সীমা অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
সেনেটে সদস্যদের ব্যক্তিগত ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন সেনেটরও কোনো বিলের অগ্রগতি বিলম্বিত করতে পারেন। সেখানে বিতর্কের সময় নিয়ন্ত্রণ ও শেষ করার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রয়েছে।
সাধারণত বিতর্ক শেষ করার জন্য ৬০ জন সেনেটরের সমর্থন প্রয়োজন হয়। তবে সব ধরনের বিল বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই নিয়ম একইভাবে প্রযোজ্য নয়। এ কারণে সেনেটে কোনো বিল নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা চলতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে অনেক সময় বিরোধী দলের সঙ্গেও সমঝোতা করতে হয়।
কমিটিতে হয় কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ
কংগ্রেসের অধিকাংশ বিস্তারিত পর্যালোচনা ও নীতিনির্ধারণী কাজ হয় বিভিন্ন কমিটিতে। প্রতিনিধি পরিষদে ২৩টি এবং সেনেটে ১৭টি কমিটি রয়েছে।
কমিটিগুলো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করে। কোনোটি অর্থনীতি ও বাজেট, কোনোটি পররাষ্ট্রনীতি, আবার কোনোটি প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য বা সরকারি প্রশাসন নিয়ে কাজ করে। এসব কমিটি বিলের খসড়া তৈরি, সংশোধন, শুনানি আয়োজন এবং সরকারি কার্যক্রম পর্যালোচনা করে।
কমিটির সদস্যরা দীর্ঘদিন একই বিষয়ে কাজ করার সুযোগ পান। ফলে সংশ্লিষ্ট খাতে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা তৈরি হয়। পাশাপাশি কমিটির পেশাদার কর্মীরাও গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও নীতিগত বিশ্লেষণে সহায়তা করেন।
কমিটির চেয়ারম্যানের ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কোন বিষয়ে শুনানি হবে, কোন বিল নিয়ে আলোচনা এগোবে এবং কোন সরকারি কার্যক্রম তদন্ত করা হবে, তা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিলের শুনানি আয়োজন না করলে সেটির অগ্রগতি কার্যত থেমে যেতে পারে।
সরকারের ওপর নজরদারি ও অর্থ নিয়ন্ত্রণ
কংগ্রেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডে নজরদারি চালানো। সরকারি অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, সরকারি সংস্থাগুলো আইন মেনে কাজ করছে কি না এবং কোথাও অপচয়, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে কংগ্রেস।
এ কাজে বিভিন্ন কমিটি শুনানি আয়োজন করতে পারে, সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত চালাতে পারে। কিছু কমিটির আইনি ক্ষমতার মধ্যে সমন জারি করে নথি বা সাক্ষ্য তলব করার সুযোগও রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম কমিটি ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে কাজ করে। সরকারি অর্থের অপচয়, অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতা তদন্ত করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এমন একটি আইনসভা, যেখানে আইন প্রণয়ন, অর্থ নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দুটি পৃথক কক্ষের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের সম্মিলিত ভূমিকা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে। তবে দুই কক্ষের মতপার্থক্য বা রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসে বিলম্বও হতে পারে। এই জটিল প্রক্রিয়াই যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।