ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বাংলাদেশের অন্যতম বেসরকারী বিমানসংস্থা। প্রায় একদশক যাবত বাংলাদেশ এভিয়েশন তথা বিশ্বের আকাশ পরিবহন সংস্থাকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে ইউএস-বাংলা। দেশের মানব সম্পদ উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এভিয়েশন সেক্টরে দক্ষ পাইলট, ইঞ্জনিয়ারসহ টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল কর্মী তৈরী করছে, যার মাধ্যমে দেশের আকাশ পরিবহন লাভবান হচ্ছে।
অগ্রসরমান বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত। এভিয়েশন সেক্টরের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে পাইলট সংকটে পতিত হচ্ছে বিশ্বের প্রায় সব বিমানসংস্থা। আর এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স অত্যন্ত দক্ষ ও সাহসিকতার সহিত ভবিষ্যত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পাইলট তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই দু’টি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বর্তমানে ৮টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ৮টি এটিআর ৭২-৬০০সহ মোট ১৯টি এয়ারক্রাফট আছে বিমানবহরে। চলতি বছর দু’টি এয়ারবাস ৩৩০ এয়ারক্রাফটসহ আরো দু’টি এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যেকোনো বিমানসংস্থার বিমানবহরে এয়ারক্রাফট সংযুক্তির সাথে সাথে অতিরিক্ত পাইলটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় কিন্তু তা সহজেই স্বল্পতম সময়ে পূরণ করা যায় না। বহরে নতুন এয়ারক্রাফট সংযোজন ও নতুন রুটের ব্যাপ্তি ঘটানোর পূর্বেই পাইলট নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করা এয়ারলাইন্সের সুষ্ঠু ও সঠিক পরিকল্পনারই অংশ।
অতিরিক্ত পাইলটের চাহিদা পূরণে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০২২ সালের শুরুতে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগের পরিকল্পনা করে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হিউম্যান রিসোর্স এর বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে ২০২২ সালের মে থেকে জুলাই মাসে প্রায় ৬৫০০ জন প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে ২১ জনকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করে।
ইতিমধ্যে ক্যাডেট পাইলটদের প্রথম ব্যাচের ১০ জন প্রশিক্ষণার্থী যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছে এপিক ফ্লাইং একাডেমীতে ফ্লাইট ট্রেনিং কোর্স শুরু করেছে। আগামী ৩০ মে দ্বিতীয় ব্যাচের ১১ জন প্রশিক্ষণার্থী ফ্লোরিডার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ক্যাডেট পাইলট প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম দেশের এভিয়েশনের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ফ্লাইট ট্রেনিং কোর্স শেষ করার পর ফেডারেল এভিয়েশন এ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (এফএএ সিপিএল) প্রাপ্ত হবেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
সফলভাবে ফ্লাইট ট্রেনিং শেষ করার পর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে ট্রেইনি ফার্স্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন। যা একজন পাইলট প্রশিক্ষণার্থীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার অপেক্ষায় থাকবে ইউএস-বাংলা। সাথে এভিয়েশনে দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে ইতিহাস সৃষ্টি করবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।
ক্যাডেট পাইলট এর মতো এভিয়েশনে দক্ষ জনশক্তি তৈরীতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ইউএস-বাংলায় ২৫০০ এর অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে, যার মধ্যে ১৯০ জনের অধিক দেশী ও বিদেশী পাইলট রয়েছে।
রোববার (২৮ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ক্যাডেট পাইলটদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণে প্রেরণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিভিল এভিয়েশন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী এমপি। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর প্রতিনিধিগণ, আটাবের প্রতিনিধিগণসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ ও ক্যাডেট পাইলটগণ ও তাদের অভিভাবকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মো. মাহবুব আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সময়োপযোগী অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইন ও নীতি প্রণয়নের ফলে দেশের এভিয়েশন শিল্প দ্রুত প্রবৃদ্ধি লাভ করছে। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের এভিয়েশন মার্কেট প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এভিয়েশন সেক্টরের এই বিপুল প্রবৃদ্ধির ধারাকে অব্যাহত রাখতে ও দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে এভিয়েশন শিল্পের প্রতিটি পর্যায়ে আমাদের আরও বেশি সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে। দক্ষ জনবলের এই বর্ধিত চাহিদা পূরণে সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আরও বেশি প্রশিক্ষিত নারী পাইলট গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেক্সট জেনারেশন এভিয়েশন প্রফেশনালস (এনজিএপি) শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছে।
তিনি বলেন, দেশের এভিয়েশন শিল্পকে সামনে এগিয়ে নিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদের বেসরকারি অংশীজনদেরও এগিয়ে আসতে হবে। দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণার্থী পাইলটদের উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইউএস-বাংলা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. মইনুল ইসলাম বলেন, আজকের অনুষ্ঠানের যে উদ্দেশ্য, আমাদের ক্যাডেট পাইলটদের ট্রেনিং করানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে। এয়ারক্রাফটের কেবিন ক্রু যারা থাকে তাদের একটা সেগমেন্ট, সবচেয়ে বড় সেগমেন্ট হচ্ছে গ্রাউন্ড স্টাফদের। যারা টেকনিক্যালি এয়ারক্রাফটকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। আমার মনে হয় না ইউএস-বাংলা শুধু যারা ফ্লাই করবেন তাদের নিয়ে থাকবে। যারা প্লেনটাকে পাইলটের কাছে হ্যান্ডওভার করে আমাদের মনে হয় পরবর্তী স্টেপ সেদিকে যাবে। ইউএস-বাংলাকে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমের মধ্যে ডেভেলপ করতে পারব। এটা আমাদের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অপারেশনস বিভাগের শিক্ষানবিশ পাইলট সাজিদ শাহাদত বলেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের শিক্ষানবিশ পাইলট প্রোগ্রাম আমাদের জন্য বড় একটি সুযোগের জানালা খুলে দিয়েছে। কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই এই প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে পেরেছি। এই প্রোগ্রাম দেশীয় এভিয়েশন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই প্রোগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাবে এই সেক্টরে আসার জন্য।
তিনি বলেন, পাইলট হওয়ার বিষয়টি অনেক ব্যয়বহুল একটি বিষয়। তাই অনেকে ইচ্ছা থাকার পরও এ সেক্টরে আসতে পারে না। ইউএস-বাংলার এই প্রোগ্রামের কারণে এখন অনেকেই পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। এজন্য ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে অবশ্যই অনেক ধন্যবাদ আমাদের এত বড় সুযোগ দেওয়ার ও বিনিয়োগ করার জন্য। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স শুধু নিজেদের কথা চিন্তা করছে তা না, তারা সমগ্র ইন্ডাস্ট্রি ও এভিয়েশন সেক্টরের নিরাপত্তার বিষয়ে খেয়াল রাখছে।
প্রশিক্ষণ শেষ করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে যোগদান করে ফ্লাই করার স্বপ্নের কথা জানিয়ে সাজিদ বলেন, এর আগে আমাদের মধ্যে ১০ জন আমেরিকার ফ্লোরিডায় প্রশিক্ষণ নিতে গেছে। আর বাকি ১১ জন আমরা যারা আছি, তারা এই মাসের ৩০ তারিখে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হব। ফ্লোরিডায় আমাদের এক বছরের প্রশিক্ষণ হবে। সেখানে এক বছরে আমরা প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স ও কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স নিয়ে আসব। দেশে এসে এয়ারলাইন্স ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স সম্পূর্ণ করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে জয়েন করে ফ্লাই করব।
রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন সাজিদ শাহাদত। ছোট থেকেই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন ছিল তার। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন এত দিন লালন করে আসছিলেন, আজ সেই স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের হাত ধরে সাজিদের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের খরচে পাইলট হয়ে দেশে ফিরবেন।
সাজিদ জানিয়েছেন, তার স্বপ্ন আজ পূরণ হতে যাচ্ছে ইউএস-বাংলার কল্যাণে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের খরচে সাজিদের মতো আরও ২০ জন দক্ষ পাইলট হয়ে দেশে ফিরে আসবেন। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২১ শিক্ষার্থীকে পাইলট বানাতে তাদের সব ধরনের খরচ বহন করে প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। সেই ধারাবাহিকতায় ৩০ মে দ্বিতীয় ধাপে ১১ জন শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন।