রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন




সেন্ট্রাল হাসপাতালে সব অস্ত্রোপচার বন্ধ: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০২৩ ৯:৫২ pm
Directorate General Health Services DGHS স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অধিদফতর হেলথ স্বাস্থ্য অধিদফতর
file pic

নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আলোচনায় থাকা ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সেই সঙ্গে হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক সংযুক্তা সাহা ওই হাসপাতালে আপাতত কোনো বিশেষজ্ঞ সেবা দিতে পারবেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমুহ) ডা. শেখ দাউদ আদনান বলেন, আইসিইউ ও জরুরি সেবার মান ‘সন্তোষজনক না হওয়ায়’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

“মাহবুবা রহমান আঁখির চিকিৎসাজনিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শন দল ও্ই হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনে আইসিইউতে রোগীর রাখার উপযুক্ত্ পরিবেশ পাওয়া যায়নি। এজন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওই হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষ বন্ধ করে দেওয়াসহ কয়েকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

শেখ আদনান বলেন, “হাসপাতালের ওটি যদি ভালো হয়, তাহলে অনেককে আইসিইউতে নেওয়া লাগে না। ওটি থেকে রোগী আইসিইউতে গেল আইসিইউতে সেই স্ট্যান্ডার্ড নাই, তখন কী হবে? তখন ওই রোগীকে আরেক হাসপাতালে রেফার করা, দৌড়াদৌড়ি করা, পেশেন্ট এক্সপায়ার হওয়া, খারাপ হওয়া। আইসিইউর স্ট্যান্ডার্ড নাই, সো আইসিইউর স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করো, তারপর ওটি স্টার্ট করো।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ডা. সংযুক্তা সাহা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লিখিত অনুমোদন ছাড়া সেন্ট্রাল হাসপাতালে কোনো বিশেষজ্ঞ সেবা দিতে পারবেন না।

মাহবুবা রহমান আঁখির পরিবারের কাছ থেকে চিকিৎসা বাবদ নেওয়া সব খরচের টাকা এবং চিকিৎসাজনিত জটিলতার যাবতীয় ব্যয় সেন্ট্রাল হাসপাতালকে বহন করতে হবে।

সেন্ট্রাল হাসপাতালে মাহবুবা রহমান আঁখির চিকিৎসায় জড়িত সব চিকিৎসকের কাগজপত্র বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে পাঠানো হবে। বিএমডিসি থেকে চিকিৎসকের নিবন্ধন বিষয়ক কোনো সিদ্ধান্ত হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

মাহবুবা রহমান আঁখির করা মামলায় গ্রেপ্তার ডা. শাহজাদী এবং ডা. মুনার আইনগত সহায়তার যাবতীয় খরচ সেন্ট্রাল হাসপাতালকে বহন করদে হবে। ভুক্তভোগী রোগীর পরিবার কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করলে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পন্ন করতে হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অভিযোগ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিলে পরবর্তীতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাহবুবা রহমান আঁখি নামের ২৫ বছর বয়সী ওই নারী সেন্ট্রাল হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সন্তান প্রসবের সময় হওয়ায় হাসপাতালে তাকে সেই চিকিৎসকের অধীনে ভর্তি করা হলেও ডা. সংযুক্তা সাহা দেশেই ছিলেন না।

অন্য চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তখন অস্ত্রোপচর করে বাচ্চা বের করা হয়। পরদিন মারা যায় শিশুটি।

ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী মাহবুবা রহমান আঁখির অবস্থাও ভালো নয়। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তিনি আছেন ল্যাবএইড হাসপাতালের সিসিইউতে।

ওই ঘটনায় আঁখির স্বামী মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী বুধবার রাতে ধানমণ্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। সেখানে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে তিনি আসামি করেছেন।

যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা ও ডা. মুনা সাহাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা হলেন ডা. মিলি, ডা. এহসান, অধ্যাপক সংযুক্তা সাহার সহকারী জমির এবং হাসপাতালের ব্যবস্থাপক পারভেজ।

ইয়াকুব আলীর অভিযোগ, সংযুক্তা সাহার অনুপস্থিতির বিষয়টি না জানিয়েই সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার স্ত্রীর সিজারিয়ান অপারেশন করে। সেখানে ‘গাফিলতির’ কারণে তার সন্তানের মৃত্যু হয়, তার স্ত্রীকে আশংকাজনক অবস্থায় অন্য হাসপাতালে ভর্তি করতে বলে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমনকি সন্তানের মৃত্যুর চারদিনেও তার লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মাহাবুবা রহমান আঁখি গর্ভধারণের পর থেকেই সেন্ট্রাল হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের অধ্যাপক সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ৯ জুন তার প্রসব বেদনা উঠলে ইয়াকুব আলী রাত সাড়ে ৯টার দিকে সংযুক্তা সাহার সহকারী জমিরেরর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানতে চান ওই চিকিৎসক হাসপাতালে আছেন কি না। জমির তাকে বলেন, ডা. সংযুক্তা সাহা হাসপাতালেই আছেন, ইয়াকুব যেন দ্রুত স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আসেন।

সেদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্ত্রীকে নিয়ে সেন্ট্রাল হাসপাতালে পৌঁছান ইয়াকুব। সংযুক্তা সাহার চেম্বারের সামনে রোগী নিয়ে যাওয়ার পর ডা. মুনাসহ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী প্রসূতিকে লেবার ওয়ার্ডে নিয়ে যান। ডা. সংযুক্তা সাহা লেবার ওয়ার্ডে রয়েছেন বলে সে সময় ইয়াকুবকে জানানো হয়।

লেবার ওয়ার্ডে নেওয়ার পর ভেতর থেকে একজন নার্স বের হয়ে আঁখিকে ভর্তি করাতে বলেন। তখনি ইয়াকুব হাসপাতালের কাউন্টারে ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে সংযুক্তা সাহার অধীনে মাহাবুবাকে ভর্তির কাজ সম্পন্ন করেন।

ভর্তি শেষে লেবার ওয়ার্ডে ফিরে ইয়াকুব স্ত্রীর অবস্থা জানতে চান, সংযুক্তা সাহার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান। কিন্তু হাসপাতালের কর্মীরা গড়িমসি করতে থাকে বলে তার ভাষ্য।

এজাহারে বলা হয়, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ইয়কুব রাত সোয়া ১টার দিকে জোর করে লেবার ওয়ার্ডে ঢুকে দেখতে পান, কয়েকজন নার্স মিলে তার স্ত্রী আঁখিকে হাঁটাচ্ছেন। ইয়াকুব জানতে চান, ডা. সংযুক্তা সাহা কোথায়। নার্সরা প্রশ্ন এড়িয়ে তাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন।

বাদী মামলায় বলেছেন, রাত আড়াইটার দিকে ডা. শাহজাদী লেবার ওয়ার্ড থেকে বের করে মাহাবুবাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। ডা. এহসানও ওটিতে ঢোকেন। পরে ডা. শাহজাদী সিজারিয়ান অপারেশন শেষ করে নবজাতককে জীবিত অবস্থায় হাসপাতালের এনআইসিইউতে নিয়ে যান। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ওটি থেকে নার্স বের হয়ে জানান, আঁখির অবস্থা আশংকাজনক।

এজাহারে বলা গয়, সেই নার্স কিছু কাগজপত্র এনে তাতে স্বাক্ষর করতে বলেন ইয়াকুবকে। তা না হলে তার স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসা দেওয়া হবে না বলে জানান। ইয়াকুব ওইসব কাগজে স্বাক্ষর করেন। ভোর পৌনে ৫টার দিকে তার স্ত্রীকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

ইয়াকুব বলছেন, ওই সময় তিনি সেন্ট্রাল হাসপাতালের ম্যানেজার মাসুদ পারভেজকে মৌখিকভাবে ঘটনাটি জানান। পরে তিনি স্ত্রী ও সন্তানের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলে হাসপাতাল থেকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এক পর্যায়ে মাহাবুবাকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে বলে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সেন্ট্রাল হাসপাতালের সহযোগিতা না পেয়ে ইয়াকুব স্ত্রীকে পাশের ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করেন। ১০ জুন বিকেল ৪টার দিকে সেন্ট্রাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জানান, এনআইসিইউতে তার নবজাতক সন্তান মারা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার মোবাইল কল দিলেও তিনি ধরেননি।

সেন্ট্রাল হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবুল কাশেম বৃহস্পতিবার বলেন, ‍“পুলিশ বলেছে, ‘এটা জুডিসিয়াল, এজন্য আপনারা কোনো স্টেটমেন্ট দিবেন না।’ এজন্য বিস্তারিত কিছু বলতে পারব না। আমরা সাময়িক বরখাস্ত করেছি।

“আমরা কয়েকজন প্রফেসরকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তারা ইন্টারোগেশন করেছে।… তারা আমাদের রিপোর্ট দেবে, এরপর আমরা কী করব- সেটা ডিসিশন নিব। যারা এটা করেছে, তাদের আমরা রাখব না। তাদের শাস্তি হবে।”

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল-বিএমডিসির রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত আলী জানান, কেউ বিএমডিসিতে লিখিত অভিযোগ করলে তারা সেটা যাচাই করেন। অভিযোগ আমলে নেওয়ার মত হলে সেটা ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে তোলা হয়। সেই চিকিৎসকের ব্যাপারে তদন্ত হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য তার সার্টিফিকেট স্থগিত করা হয়।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD