আল-কুরআনে আল্লাহতায়ালা মানুষকে লক্ষ করে যত সুসংবাদের কথা বলেছেন, তার অধিকাংশই ইমানদারদের উদ্দেশ করে। কারণ মানুষের সামাজিক মর্যাদা মূল্যায়ন করার জন্য মানুষ যেমন মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা, একাডেমিক যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, বংশীয় আভিজাত্য এগুলোকে তার ভাব ও মর্যাদার প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করে, তেমনি মানুষের রব মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনও একটি ভিন্ন আঙ্গিকে মানুষকে বিচার করে থাকেন।
তবে সেই বিচার, দুনিয়ার কোনো মামুলি বিচারের মতো নয়। মানুষ যেমন মানুষের বংশ মর্যাদার গৌরব ও ধনসম্পদের আভিজাত্যে মুগ্ধ হয়ে দুষ্ট মানুষকেও নিজ স্বার্থে আপন করে নেয়, কিন্তু আল্লাহর বিচার এ জাতীয় সব হীন বিচার থেকে মুক্ত। তিনি পছন্দ করেন শুধু তাকেই, যে তার ওপর পূর্ণ ইমান রাখে, অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। যে ভালোবাসা পৃথিবীর সব থেকে তার কাছে দামি; আর সে ভালোবাসা ও ইমানের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে দ্বীন ইসলামের ওপর অবিচল থাকে।
তাই হাজারও বাধাবিপত্তি ও ইমানের পরীক্ষায় সে দ্বীন ইসলামকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে দ্বীনের রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করে। দুনিয়ার কোনো মোহ তাকে প্রলুব্ধ করতে পারে না। সে কখনোই স্বার্থের বিনিময়ে আল্লাহর মহব্বতকে জলাঞ্জলি দিয়ে শয়তানের পথ ও মতকে গ্রহণ করতে পারে না। হকের পথে সে তার জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দেয়। এর বিনিময় সে আল্লাহর কাছেই কামনা করে।
যারা শয়তানের এ পথ ও মতের বিরুদ্ধে আপসহীন থেকেছে তারাই হয়েছে আল্লাহর বন্ধু। যে বন্ধুর সম্মান রয়েছে এ পৃথিবীতে তেমনি আখিরাতেও। ফেরেশতারা তাদের মৃত্যুর সময় বলবে, ‘আমরা দুনিয়ার জীবনেও তোমাদের বন্ধু এবং আখেরাতেও…’ (সূরা হা-মীম আস সাজদা, আয়াত ৩১)। এসব মানুষকে সুসংবাদ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না’ (সূরা ইউনুস, আয়াত : ১০)।
কিয়ামতের কঠিন ময়দানে মানুষ যখন পেরেশান হয়ে ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করবে, সেই বিপদের ভয়াবহতা দেখে পরম আদুরিনী মাও তার গর্ভজাত সন্তানকে চিনতে চাইবে না, সেই কঠিন মুসিবতের দিন আল্লাহর অলিদের কোনো ধরনের চিন্তা ও অস্থিরতা থাকবে না। কারণ তারা থাকবে আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। যাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদ জীবনের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যা কখনোই লঙ্ঘিত হবে না।
এ বুঝদার অন্তর পয়দা করতে হলে নিজেকে নিয়ে ভাবতে হবে। নিজেকে বুঝতে পারলে আল্লাহকে বোঝাও সহজ । এ বোঝার মধ্য দিয়ে যে ইমান তৈরি হয়, সে ইমান বড় মজবুত ইমান। এ ইমান যার দিলে থাকে দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসায় সে কখনো মত্ত হয়ে আখেরাতকে ভুলে যায় না। সে আল্লাহর প্রতি ইমান রেখে যেমন সব সময় চলে তেমনি ইমানের পরীক্ষা এলে সে পরীক্ষায় কখনো ইমানহারা হয়ে পড়ে না।
ইমানদার মুসলমানের চিরশত্রু শয়তান, সে নানাভাবে ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা দিয়ে মানুষকে ইমানহারা করে মুনাফিক ও কুফরি মৃত্যুর দিকে টেনে নিতে চায়। এ কারণে মুসলমান ও ইমানদার মানুষের জীবন কখনোই ভাবনা-চিন্তাহীন জীবন হতে পারে না। সাচ্চা ইমানের সঙ্গে আল্লাহর সঙ্গে মোলাকাত করতে হয় ইমানি অন্তর। আল্লাহকে জানা ও বোঝার পর, যে ইমানকে সে ধারণ করেছে তার ওপরই অবিচল থেকে ইমানের সঙ্গে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে চায়। তাহলে আল্লাহর দেওয়া প্রতিশ্রুতির হকদার সে হবে।
আল-কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা বলে, আল্লাহতায়ালাই হচ্ছেন আমাদের রব, অতঃপর ইমানের ওপর তারা অবিচল থাকে, মৃত্যুর সময় তাদের কাছে ফেরেশতারা নাজিল হবে এবং বলবে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না, তোমাদের কাছে যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছিল, তোমরা তার সুসংবাদ গ্রহণ করো’ (সূরা হা-মীম আস সাজদা, আয়াত ৩০)।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক।