ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার দক্ষিণে খান ইউনিস এলাকায় চলছে ইসরায়েলের তীব্র হামলা। নির্বিচার বোমার আঘাতে তছনছ হয়েছে পুরো এলাকা। হামাস সদস্যদের খুঁজতে ঘরে ঘরে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার বাসিন্দারা ‘ঘোরতর বিপদের’ মধ্যে রয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।
ইসরায়েলের নৃশংসতার মুখে উপত্যকাটির ২৪ লাখ মানুষের ৮০ শতাংশের বেশি এখন ভিটেমাটিছাড়া। গাজার একেবারে দক্ষিণে মিসর সীমান্তবর্তী রাফাহ এলাকায় অস্থায়ী তাঁবুতে চরম মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁদের অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে কাতারসহ কয়েকটি দেশ।
যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক ফোনকলে তিনি গাজায় বেসামরিক মানুষের হতাহতের বিষয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির’ লক্ষ্যে তৎপরতার ওপর জোর দিয়েছেন মাখোঁ। এ অবস্থায় জিম্মি ও বন্দিবিনিময়ের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল।
গত ৭ অক্টোবরের হামলায় ইসরায়েল থেকে প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করেছিল হামাস। পরে গত মাসের শেষের দিকে সাত দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে তাঁদের অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়। এখনো হামাসের হাতে ১২৯ জন জিম্মি আছেন বলে দাবি ইসরায়েলের। এসব জিম্মিকে মুক্ত করতে ইসরায়েল সরকার নতুন বন্দিবিনিময় চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম চ্যানেল ১৩।
কাতারের কাছে উত্থাপন করা ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরায়েল প্রথমে গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সেনাদের সরিয়ে নেবে। একই সঙ্গে উপত্যকাটিতে আরও ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। বিনিময়ে নিজেদের কাছে জিম্মি থাকা ইসরায়েলি ও মৃত ইসরায়েলিদের মরদেহ ফেরত দেবে হামাস। তবে চ্যানেল ১৩ জানিয়েছে, ইসরায়েলের ওই প্রস্তাব এখনো গ্রহণ করেনি হামাস।
গাজাজুড়ে ইসরায়েলের অভিযানে অংশ নিয়েছে দেশটির বাহিনীর চার ডিভিশন সেনা। শুধু খান ইউনিসে বর্তমানে ছয় ব্রিগেড সেনা সদস্য অবস্থান করছেন।
পূর্ব জেরুজালেম থেকে আজ বৃহস্পতিবার আল–জাজিরার সংবাদদাতা লরা খান জানিয়েছেন, গাজায় অন্তত চার ডিভিশন সেনা ছাড়া উপত্যকাটির সীমান্তে আরেক ডিভিশন সেনা মোতায়েন করেছে ইসরায়েল। প্রতি ডিভিশনে ৬ থেকে ২৫ হাজার সেনা থাকতে পারে। একটি ডিভিশনের অধীনে একাধিক ব্রিগেড থাকে।
৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এ পর্যন্ত উপত্যকাটিতে ২১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছিল স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গতকাল আরও ইসরায়েলি হামলা ও হতাহতের খবর দিয়েছে হামাস পরিচালিত দপ্তরটি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ সকালে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া, দক্ষিণে খান ইউনিস ও মধ্যাঞ্চলে মাঘাজি শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। হামাসসংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা সাফা জানিয়েছে, নতুন নিহত মানুষের মধ্যে রয়েছেন মাঘাজি শিবিরে একটি ও বেইত লাহিয়ায় চারটি বাড়িতে চালানো হামলার ভুক্তভোগীরা। আর খান ইউনিসের আল-আমাল হাসপাতালের আশপাশে ইসরায়েলের গোলাবর্ষণেও অনেকে নিহত হয়েছেন।
গাজাবাসী ভয়ানক বিপদের মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস। বুধবার যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার বাসিন্দাদের অনাহার ও দুর্দশার কথা উল্লেখ করে তেদরোস এই সতর্কতার কথা বলেন।
ডব্লিউএইচও বলেছে, মঙ্গলবার গাজার দুটি হাসপাতালে তারা ত্রাণ সরবরাহ করেছে। গাজার ৩৬টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৫টির সক্ষমতা রয়েছে।
গাজাবাসীকে চরম বিপদ থেকে রক্ষা করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডব্লিউএইচওর প্রধান। অনাহারে, আহত অবস্থায় ও রোগের ঝুঁকিতে থাকা গাজাবাসীর সহায়তার জন্য ত্রাণকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। এক বিবৃতিতে ডব্লিউএইচও বলেছে, ‘ক্ষুধার্ত লোকজন আজ আমাদের গাড়ি থামিয়েছেন এবং খাবারের খোঁজ করেছেন।’
গাজায় সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের শত্রু ইরানের দ্বন্দ্বও তত বাড়ছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। সোমবার সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ডার রাজি মৌসাভি নিহত হন। এ ঘটনার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে ইরান। আজ রাজধানী তেহরানে মৌসাভিকে শোকাবহ এক পরিবেশে দাফন করা হয়েছে।
মৌসাভির মৃত্যুর পর কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা রামেজান শরিফ। যদিও গাজায় চলমান সংঘাত শুরুর পর থেকেই লেবানন থেকে ইসরায়েলে হামলা চালাচ্ছে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এ ছাড়া ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনে ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে বুধবার বিক্ষোভ করেছেন ফিলিস্তিনের সমর্থকেরা। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’, ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ লেখা স্লোগান ছিল। পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, বিক্ষোভকারীরা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে মাটিতে ফেলে দেন। আবর্জনা, গাছের ডাল ও ইট–পাথর ফেলে বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার রাস্তা অবরোধ করেন। এ সময় তাঁরা বিভিন্ন যানবাহনেও হামলা চালান।
এএফপি ও আল জাজিরা