ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির এক মাস পূর্তি উপলক্ষে ‘শহীদি মার্চ’ কর্মসূচির আয়োজন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ছাত্রদের ডাকে এই মার্চে রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি, মাদ্রাসা ও স্কুলের শিক্ষার্থীসহ লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন। মার্চ চলাকালে আশপাশের দোকানিরা হাত নাড়িয়ে তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন।
মার্চটি বিকাল পৌনে ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে থেকে বেরিয়ে নীলক্ষেত, মিরপুর রোড হয়ে বেলা ৫টায় মানিক মিয়া এভিনিউয়ে প্রবেশ করে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে সংসদ ভবন এলাকা অতিক্রম করে মার্চটি। পরে ফার্মগেট হয়ে শহীদ মিনার গিয়ে কর্মসূচি শেষ হবে।
লাখো ছাত্র-জনতার এই শহীদি পদযাত্রায় মুহুর্মুহু ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে মু্ক্তির স্লোগান, মুক্ত বাংলাদেশের স্লোগান। মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ গণআন্দোলনে নিহত অনেকের নাম।
শহীদদের স্মৃতি উচ্চারণ করে তাদের আত্মত্যাগের মহিমাকে স্লোগানের ভাষায় রূপ দিয়ে রাজপথের উত্তাল জনতা ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার শপথ নিয়ে পায়ের তালে পা রেখে ঢাকার রাস্তা প্রদক্ষিণ করছে।
এ সময় ছাত্র-জনতা স্লোগান দেয়, ‘তুমি কে আমি কে/ বাঙালি, বাঙালি’, ‘আবু সাঈদ মুগ্ধর রক্ত/ বৃথা যেতে দেব না’, ‘আমার ভাই কবরে/ খুনি কেন বাহিরে’, ‘লেগেছে রে লেগেছে/ রক্তে আগুন লেগেছ ‘, ‘বিচার চাই, বিচার চাই/ খুনি হাসিনার বিচার চাই।’
শিক্ষার্থীরা ‘আমাদের শহীদেরা/ আমাদের শক্তি’, ‘আবু সাইদ মুগ্ধ/ শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘২৪ আমাদের বিশ্বাস’- এ ধরনের নানা স্লোগান দেয়।
মিছিলের স্লোগানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দাবি করা হয়। তার আমলে হত্যা, গুম-খুনের বিচারের আওয়াজ ওঠে।
মার্চে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়। এছাড়া ধাপে ধাপে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনও তাদের দল নিয়ে মার্চ করে যায়। মার্চে অংশ নেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও। সর্ব প্রথম দলটিতে রয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা। অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা দিতে মার্চের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি রয়েছে।
মার্চে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের পতাকা মাথায় বেঁধে লাঠির আগায় উড়াতে থাকেন। কেউ কেউ শহীদদের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসেছেন।
এ সময় ছাত্র-জনতা হত্যার দায়ে শেখ হাসিনার ফাঁসি চেয়ে স্লোগান দেন উপস্থিত ছাত্র-জনতা। এছাড়া শহীদের রক্তের অর্জনকে বৃথা যেতে না দেওয়ার স্লোগানও দেওয়া হয়। তারা আবু সাইদ-মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ; আমাদের শহীদেরা, আমাদের শক্তি; ২৪ আমাদের বিশ্বাসসহ একাধিক স্লোগান দেন।
মার্চে তেজগাঁও কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ, নূরজাহান বেগম উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি কমার্স কলেজ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, খিলগাঁও মাকজালুল উলুম মাদ্রাসাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও জনতা এ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।
শহীদি মার্চে তেজগাঁও কলেজ, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নূরজাহান বেগম উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি কমার্স কলেজ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজ, অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়, খিলগাঁও মাকজালুল উলুম মাদরাসাসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।
মার্চটি রাজু ভাস্কর্য হয়ে রাজু ভাস্কর্য থেকে নীলক্ষেত হয়ে সায়েন্সল্যাব, কলাবাগান, মানিক মিয়া এভিনিউ (সংসদ ভবনের সামনে দিয়ে), ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ হয়ে আবার রাজু ভাস্কর্য দিয়ে শহীদ মিনারে এসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্তি বলপ্রয়োগের ফলে শেষপর্যন্ত সরকার পতনের একদফায় রূপ নেয়। ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। পালিয়ে ভারতে চলে যান তিনি।
৮ অগাস্ট বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার, যেখানে জায়গা করে দেওয়া হয় দুজন ছাত্র নেতাকে, যারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক মাস পূর্তিতে একটি বার্তা দিয়েছেন।
বার্তায় তিনি বলেছেন, “আমাদের তরুণ বিপ্লবীরা দেশের মানুষের মনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়েছে তা পূরণে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শহীদদের আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে চাই। এক নতুন যুগের সূচনা করতে চাই।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা নিলাম- শহীদদের রক্ত এবং আহত ভাইবোনদের আত্মত্যাগকে জাতি হিসাবে আমরা কিছুতেই ব্যর্থ হতে দেবো না। যে সুযোগ তারা আমাদের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন, সে সুযোগকে আমরা কখনো হাতছাড়া হতে দেবো না।
“আজ তাদের স্মৃতিময় দিনে আবারো প্রতিজ্ঞা করলাম তাদের স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ আমরা গড়বই।”