রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন




সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় সেবা বঞ্চিত বাসিন্দারা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৪ ১২:৫৩ pm
নগর ভবন Dhaka South City Corporation DSCC ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ডিএসসিসি
file pic

পুরোপুরি নাগরিকসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকার বাসিন্দারা। কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করায় যেসব সেবা নগরবাসী পেতেন, তার ছিটেফোঁটাও এখন মিলছে না। এ অবস্থায় সেবা নিয়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভোগান্তি। প্রতিদিনই কাউন্সিলর অফিসে গিয়ে সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাদের।

গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশের ১২ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণের পর ঢালাওভাবে সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলরদেরও বরখাস্ত করা হয়। সিটি করপোরেশন-পৌরসভাগুলোতে বসানো হয় প্রশাসক। তারা কোনো রকম মেয়রদের দায়িত্ব পালন করলেও কাউন্সিলরদের ঘাটতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজধানীর দুই সিটিসহ অন্য সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলরদের দায়িত্বে পৃথক কমিটি গঠন ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের কাউকে কাউন্সিলর অফিসে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারা কোন ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করবেন, তাও এতদিনে চূড়ান্ত করা হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সচিব (উত্তর বাসাবো) কুতুবুদ্দিন সোহেল বলেন, লোকজন তো বিভিন্ন প্রয়োজনে আসেন। কিন্তু তাদের জন্য কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। আগে কাউন্সিলরদের প্যাডে বিভিন্ন সনদ দেওয়া হতো। এখন ওই প্যাড ব্যবহার করা যায় না। নতুন প্যাড ছাপা না হওয়া পর্যন্ত কোনো সনদ দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি, প্যাড এলেই সেবা প্রদান শুরু হবে।

৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের বরখাস্ত আদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

প্রায় একই কথা বলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের (পল্লবী এলাকার একাংশ) সচিব আব্দুস সামাদ প্রধান। তিনি বলেন, যাদের কাউন্সিলরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা কেউ কাউন্সিলর অফিসে আসছেন না। এখন শুধু জন্মনিবন্ধন সনদ নিতে এলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিদিন নিয়ে যাচ্ছি। তিনি সেগুলো স্বাক্ষর করে দিচ্ছেন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনের জন্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে পৃথক কমিটি গঠনের আদেশ জারি করা হয়। এতে প্রশাসককে প্রধান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের দুই কমিটির সদস্য রাখা হয়েছে ২৫ জন করে। কমিটিতে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব প্রতিনিধিই কাউন্সিলর হিসেবে সেবা প্রদান করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে অন্য সিটি করপোরশেন ও পৌরসভায় সংখ্যাভেদে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ১০ জন করে থাকা আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকেও কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনের আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু যাদের দিয়ে কমিটি করা হয়েছে, তাদের নিজস্ব আরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি কাউন্সিলরদের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হবে। এ অবস্থায় একজন কাউন্সিলর যত ধরনের সেবা নগরবাসীকে দিতেন, তাদের পক্ষে ততটা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ হিসেবে উভয় সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা ও সাবেক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন সনদ ছাড়াও এলাকার ছোট-বড় নানা সমস্যা নিয়ে এলাকাবাসী কাউন্সিলরদের দ্বারস্থ হতেন। কাউন্সিলর আলোচনা করে সমাধান দিতেন। তাদের সীমিত পরিসরের বিচারিক ক্ষমতা থাকায় অনেক কিছুর বিচার-আচারও করতেন কাউন্সিলররা। এ ছাড়া এলাকার ভাঙা রাস্তাঘাট, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, বর্জ্য অপসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা ধরনের তথ্য সিটি করপোরেশনকে দিয়ে সহযোগিতা করতেন। নিজেরাও মাঠ পর্যায়ে এসব কার্যক্রম তদারকির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতেন। সেসব কাজ একেবারেই শূন্য।

সাম্প্রতিক একাধিক অতিবর্ষণের ঘটনায় রাজধানীর রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। সেগুলো মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে আগে কাউন্সিলররা নগর ভবনে গিয়ে তদবির করে নিজ নিজ এলাকার রাস্তা মেরামতের ব্যবস্থা করতেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম তদারকি করতেন। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়ার কারণে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও নিহতের ঘটনা ঘটছে। এমন প্রেক্ষাপটে কাউন্সিলরদের শূন্যতায় ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

আবার রাজধানীর উত্তর সিটির সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন ৫৪ জন এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর ১৮ জন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন ৭৫ জন এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর ছিলেন ২৫ জন। সব মিলিয়ে কাউন্সিলর ছিলেন ১৭২ জন। সেখানে দুই সিটি করপোরেশনের ২৫ সদস্যের দুই কমিটিতে ৫০ জন ও ১০ জন করে আঞ্চলিক কর্মকর্তা ২০ জনসহ ৭০ জনকে ১৭২ কাউন্সিলরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই কমিটিতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক প্রধান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। অন্য সবাই অন্যান্য সেবা সংস্থার সদস্য। কিন্তু ওইসব সেবা সংস্থার কে কে কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করবেন, তাও নিশ্চিত হয়নি। এ অবস্থায় কার্যত আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা ছাড়া কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালনের মতো আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৫ আগস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের মেয়র-কাউন্সিলররা গা-ঢাকা দেন। সেই থেকে শুরু হয় নগরবাসীর সেবা ভোগান্তি। কারণ হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া কাউন্সিলরদের সবাই ছিলেন সরকারি দলের। এর পর গত ১৯ আগস্ট সব সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তখন সেবা সংকট আরও বাড়ে। পরে গত ২৬ সেপ্টেম্বর একযোগে সব সিটি করপোরেশন ও ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলরকে বরখাস্ত করা হয়। এর পর থেকে আর নাগরিক সেবার কোনো বালাই নেই। অনেক কাউন্সিলর অফিস এখনও বন্ধ। অনেকগুলো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। তার পরও অনেকে সেবা নিতে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

ঢাকা উত্তর সিটির ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিসটি ভেঙেচুরে তছনছ করা। আর সামনে কিছু বাঁশ-কাঠ পড়ে রয়েছে। কার্যালয়টিতে ছেলের জন্য প্রত্যয়নপত্র নিতে এসেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ইশারফ হোসেন। তিনি বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির শর্তে জন্মনিবন্ধন, কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র ও নাগরিকত্বের সনদ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি কাউকেই পাচ্ছেন না। কেউ কিছু বলতেও পারছেন না। ওয়ার্ড সচিবকেও খুঁজে পাচ্ছেন না এলাকাবাসী।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিদিনই এলাকাবাসী নানা প্রয়োজনে তাঁর বাসায় ভিড় করছেন। কারও প্রত্যয়নপত্র দরকার, কারও নাগরিক সনদ দরকার। কিন্তু এগুলো দেওয়ার এখতিয়ার এখন তাঁর নেই।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির মুখপাত্র মকবুল হোসেন জানান, কাউন্সিলরদের দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার বৈঠক হয়েছে। কীভাবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন এসব বিষয়ের সমাধান হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, এই মুহূর্তে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জনপ্রতিনিধিদের অস্তিত্ব অনুপস্থিত। এই বিশেষ ব্যবস্থা কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত করা যাবে না। এতে নাগরিক সুবিধা ব্যাপক মাত্রায় লঙ্ঘিত হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, সেটা দ্রুত সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন প্রয়োজন। যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেটা দ্রুত কাটিয়ে উঠে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দিতে হবে। কারণ জনপ্রতিনিধিরা ভালো-খারাপ হলেও তাদের লাগবে। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD