গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
রোগীদের বিদেশমুখীতায় বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে বাংলাদেশ। যার বেশিরভাগই ভারতের দ্রুত-বর্ধনশীল স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করছে। তাই ভারতের ভিসা বন্ধ দেশের চিকিৎসাখাতের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরে চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এখনই সময় স্বাস্থ্যখাত সংস্কার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিতে বিনোয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মেডিকেল হাব হিসেবে গড়ে তোলার।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘চিকিৎসা সেবায় বিদেশমুখীতা: আমাদের উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
সভায় মূল প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাশে থেকে বিশ্বে চিকিৎসা নিতে যাওয়া ৩২২ পর্যটকের সমীক্ষায় জানা যায়, ৫১.৫ গিয়েছেন ভারতে, ২০ শতাংশ সিঙ্গাপুর, ২০ শতাংশ থাইল্যান্ডে ও অন্যান্য দেশে ১০ শতাংশ। এদের মধ্যে ৫২.৫ শতাংশ বিদেশ যান শুধু মাত্র সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। এছাড়া সার্জারির জন্য ২৭.৬ শতাংশ, ক্যান্সার/ টিউমার চিকিৎসায় ৬.৫ শতাংশ। দাঁতের চিকিৎসার জন্য ২.২ শতাংশ। এসব ব্যক্তিদের ১০.৬ শতাংশ চিকিৎসার জন্য গিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রসাধণী ক্রয় করেন।
১১৯৬ পর্যটকের ওপর করা আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি বিশ্বে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন হার্টের সমস্যা নিয়ে। যা মোট পর্যটকের ১২.২০ শতাংশ, চোখের চিকিৎসার জন্য ১০.৫৩ শতাংশ, কিডনির সমস্যা নিয়ে ৮ শতাংশ, বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার নিয়ে ৭.৫২ শতাংশ, ৭.৫২ শতাংশ ফ্র্যাকচার, ৬.৯৩ হাড়ের সমস্যা, ৬.৪৩ শতাংশ পেটের সমস্যা। এছাড়া লিভার, কিডনি, ডায়াবেটিস, গাইনি সমস্যা নিয়েও রোগী বিদেশে যাচ্ছেন।
১২৭৮ পর্যটকের ওপর করা আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৮৬ জন বা ৩৮ শতাংশ পর্যটকের দেশের বাইরে থাকার সময়কাল গড়ে এক সপ্তাহ। ৩৫ শতাংশ দুই সপ্তাহ। এক মাস থাকেন ৮ শতাংশ, দুই মাস ৫ শতাংশ, তিন মাস ৩ শতাংশ ও ছয় মাস অবস্থান করেন ২ শতাংশ পর্যটক।
১১৮১ পর্যটকের ওপর আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৫ শতাংশ বা প্রতি চারজন পর্যটকের একজনের পেশায় ব্যবসায়ী। এরপর ১২.৫৩ শতাংশ বেসরকারি চাকরিজীবী, ১২ শতাংশ দিনমুজুর, ৯.৪৮ শতাংশ সরকারি চারকীজীবী, ৭.৫৩ শতাংশ শিক্ষক। এছাড়া এ তালিকায় সাংবাদিক, চিকিৎসক, পুলিশ, ছাত্রও রয়েছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখীতার কারণ হলো আস্থাহীনতা। এর সাথে কিছু ক্ষেত্রে অদক্ষতাও দায়ী। এছাড়া আমাদের ব্যবহার ও অযত্নের কারণে রোগীরা বিদেশি ছুটে। তবে আমরাও (রোগীরা) অধ্যাপক ও খ্যাতিমান ডাক্তার ছাড়া চিকিৎসক দেখাই না, এমনকি আশা করি ১৫ মিনিট ধরে রোগী দেখবে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি বিনিময় কম। বর্তমানে চিকিৎসায় যে সংকট তৈরি হয়েছে এটি উত্তরণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিবেশি দেশ চিকিৎসা বন্ধ করেছে, এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, ভারত ভিসা বন্ধ করে আমাদের উপকার করেছে। আমাদের সক্ষমতা বাড়তে সহযোগিতা করেছে। সরকারের উচিত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা, সর্বাধুনিক টেকনোলজি সমৃদ্ধ করে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব ডা. মো. সারোয়ার বারী বলেন, রোগীদের বিদেশগামীতার কারণে প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে যাচ্ছে। চিকিৎসায় বিদেশমুখীতা কমাতে দেশে রোগ শনাক্তে খরচ কমিয়ে আনতে হবে। এছাড়া দেশে বিশেষায়িত সেবা বাড়াতে আগামী জুনের মধ্যে বাংলাদেশ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করা হবে।