দেশের স্কুলশিক্ষায় বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে আরবিকে সেই ভাষা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৭ সালের পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের প্রস্তুতির আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি নতুন ভাষা সংযোজনের উদ্যোগ নয়, বরং ভবিষ্যৎ শিক্ষাক্রমে বৈশ্বিক দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের বহুভাষিক সক্ষমতা তৈরির বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তবে, নতুন এই উদ্যোগ শুরুতেই সারাদেশে একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে না। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে পাইলটিংয়ের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট দুই-তিনটি শ্রেণি এবং নির্বাচিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি চালু করা হতে পারে। সরাসরি প্রতিটি স্কুলে নয়, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আরবিকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় নেওয়ার পেছনে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বাস্তব চাহিদাও কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা ও ভাষাগত যোগাযোগের সুযোগ বিবেচনায় আরবিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে, এটি স্কুলের নিয়মিত পাঠ্যসূচির বাধ্যতামূলক বিষয় হবে, নাকি ঐচ্ছিক বা সহশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় থাকবে— সেই সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষকদের প্রস্তুতি, অবকাঠামো, পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু, প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতাসহ সবকিছু পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতা যাচাই করে পরে ধাপে ধাপে এটি বিস্তৃত করা হতে পারে। দেশের শিক্ষকদের বড় অংশ এখনও এ বিষয়ে প্রস্তুত নন। তাই শুরুতে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বদলে বিকল্প কাঠামো নিয়ে ভাবা হচ্ছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নির্দিষ্ট ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র, সরকারি ইনস্টিটিউট বা নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাপানি, কোরিয়ান বা অন্য বিদেশি ভাষার মতো কোর্স চালুর ভাবনা রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের পরই বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবি বর্তমানে ২০২৭ সালের পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ করছে। নতুন কিছু বিষয় যুক্ত করা, পুরোনো কিছু বিষয় বাদ দেওয়া, বইয়ের কাঠিন্য কমানো এবং শিক্ষার্থীদের শেখাকে আরও আনন্দময় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে। তৃতীয় ভাষা সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি সম্ভাব্য নতুন সংযোজন।
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, ২০২৮ সাল থেকে একটি নতুন শিক্ষাক্রম চালুর নীতিগত আলোচনা চলছে। তবে, সেটি সব শ্রেণিতে একযোগে বাস্তবায়ন হবে না। ধাপে ধাপে, পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি শ্রেণি দিয়ে শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
‘সাধারণত কারিকুলামে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পরিবর্তন আনা হয়। তবে, এবার যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ষষ্ঠ শ্রেণি বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট স্তর থেকে নতুন ব্যবস্থার পাইলটিং শুরু হতে পারে। আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগে এর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।’
এছাড়া, আগামী ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে শিক্ষার্থীদের শেখাকে আরও আনন্দময় ও বাস্তবমুখী করতে কয়েকটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, একই সঙ্গে বিদ্যমান কিছু বইতেও বড় ধরনের পরিমার্জন আনা হবে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘জয় অব হ্যাপিনেস’ বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি নতুন বই যুক্ত করার আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বইটির মূল উদ্দেশ্য হবে আনন্দভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষের শেখার পরিবেশকে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তোলা। তবে, এটি আলাদা একটি বিষয় হিসেবে থাকবে, নাকি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পড়ানো হবে, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। এনসিটিবি সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে গবেষণা ও অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্ব দিতে চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক নতুন বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বইয়ে শুধু তাত্ত্বিক পাঠ নয়, খেলাধুলার ব্যবহারিক চর্চাও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অবশ্য এরই মধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনার ভিত্তিতে সাতটি খেলা জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিকভাবে ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, কারাতে বা কাবাডি, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিকস ও সাঁতারের মতো খেলাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এসব খেলার পাঠ ও ব্যবহারিক অংশ অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা রয়েছে।
আবার প্রযুক্তি শিক্ষাতেও আসছে নতুন পরিবর্তন। এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, মাধ্যমিক স্তরের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিষয়ে নতুন কনটেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে এআই, ডিজিটাল দক্ষতা এবং ব্যবহারিক প্রযুক্তি জ্ঞানের ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে, এটি আলাদা অধ্যায় না হয়ে প্রাসঙ্গিক পাঠের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রম নিয়ে বিস্তৃত কাজ হবে এবং বর্তমান কারিকুলামকে সময়োপযোগী করে পরিমার্জন করা হবে। নতুন বইয়ের কনটেন্ট এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হবে।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্ব দিতে চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক নতুন বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে / ছবি- সংগৃহীত
‘বই আমরা সবসময় সর্বোচ্চ নির্ভুল করার চেষ্টা করি। নির্ভুল বলে কোনো বই নেই, তবে ভুল যাতে সর্বনিম্ন থাকে, সে চেষ্টা চলছে। নতুন সরকারের সময় নতুন উদ্যোগে বইয়ের কনটেন্ট আগের চেয়ে আরও উন্নত করার কাজ করা হচ্ছে। শুধু ছাপা বা কাগজের মান নয়, বিষয়বস্তুর মানও বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে।’
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়বস্তু সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চলমান পরিমার্জন কার্যক্রমে বিভিন্ন বইয়ের জটিল ও তুলনামূলক কঠিন বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীর বয়স, মানসিক সক্ষমতা ও শ্রেণি উপযোগিতা বিবেচনায় কিছু অধ্যায় সহজ করা কিংবা সংক্ষিপ্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, কিছু পাঠ্যবইয়ে এমন বিষয় রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় কঠিন হয়ে গেছে। আমরা দেখেছি, কিছু জায়গায় এমন বিষয় আছে যেগুলো না জানলেও শিক্ষার্থীর মৌলিক শেখায় খুব প্রভাব পড়ে না। সেগুলো পরিমার্জন করে সহজ করা হবে।
‘আগে এক শ্রেণিতে যা শেখানো হতো, পরের শ্রেণিতে গিয়ে তার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে এগোতে পারত। কিন্তু বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। ফলে একটি শ্রেণির শেখা পরবর্তী শ্রেণিতে পর্যাপ্তভাবে কাজে লাগছে না। নতুন পরিমার্জনে এই বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে বইয়ের চাপ কমবে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও কিছুটা কমবে।’
অন্যদিকে, ২০২৮ সাল থেকে সম্ভাব্য নতুন শিক্ষাক্রম চালুর সঙ্গে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। জানা গেছে, প্রচলিত পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তে কিছু বিষয়ে বিকল্প মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সব বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা এবং বাকিগুলো ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ১০টি বিষয়ের পরীক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে পাঁচটি বিষয়ে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া এবং বাকি বিষয়গুলো শ্রেণিকক্ষভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বিষয়টি বিবেচনায় আছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু বিষয় পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে, আর অন্য বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, ব্যবহারিক কাজ, ক্লাস পারফরম্যান্স ও ধারাবাহিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যক্রম) এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় নির্ধারণ করা নয়; একজন শিক্ষার্থী কী শিখল, কতটুকু দক্ষতা অর্জন করল, সেটি যাচাই করা। শুধু জিপিএ-ফাইভের প্রতিযোগিতা নয়, শেখার ফল কতটা অর্জন হয়েছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কিছু বিষয়ে পরীক্ষা এবং কিছু বিষয়ে অ্যাসেসমেন্ট— এ ধরনের একটি কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষাপদ্ধতির এই পরিবর্তন ২০২৭ সালের বইয়ের সঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এটি ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের আলোচনার অংশ। নতুন শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত হওয়ার পর পাইলটিং ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষার এই পরিবর্তন কার্যকর করা হতে পারে। ঢাকা পোস্ট