সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন




একটি শব্দেরও একটি পক্ষ থাকে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ ১১:৩৬ am

এস এম নাজমুল হক ইমন :: একটি সংবাদ প্রকাশিত হলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাজার মানুষ তা পড়ল, শত মানুষ শেয়ার করল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হলো। পরদিন নতুন খবর এলো। আগের খবরটি হারিয়ে গেল। কিন্তু যে মানুষটিকে নিয়ে খবরটি হয়েছিল, তার জীবনে সেই সংবাদ হয়তো থেকে গেল আরও বহু বছর। এই জায়গাটিই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় দায়িত্বের জায়গা।

একটি শিরোনাম, একটি ছবি, একটি বিশেষণ কিংবা একটি বাক্য। কখনো কখনো একজন মানুষের পরিচয়কে মানুষের চোখে নতুন করে তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন সেই মানুষটি নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা সমাজের কোনো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য। তখন প্রশ্ন শুধু খবরটি সত্য কি না, এখানেই শেষ হয় না। প্রশ্ন আরও আছে!

আমরা কিভাবে সত্যটি বলছি? কার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি? কাকে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছি? কাকে বাদ দিচ্ছি? এবং আমাদের গল্পটি প্রকাশের পর সেই মানুষটির জীবনে কী প্রভাব পড়তে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই তৈরি করে জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার ভিত্তি।

জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাত নয়। বরং এটি সাংবাদিকতার এমন একটি দায়িত্বশীল চর্চা, যেখানে একজন মানুষকে তার লিঙ্গ, বয়স, সামাজিক অবস্থান বা পরিচয়ের আগে একজন মানুষ হিসেবে দেখা হয়। এখানে মর্যাদা আছে। আছে অন্তর্ভুক্তি। আছে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। আর আছে এমন একটি ভাষার ব্যবহার, যা কোনো মানুষকে ছোট না করে বরং তার বাস্তবতাকে যথাযথভাবে তুলে ধরে।

খবরের পাতায় কে ‘মানুষ’, আর কে শুধু ‘ঘটনা’?
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নারী ও শিশুদের নিয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, পাচার, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো নিয়ে সংবাদ হওয়া জরুরি। কিন্তু অনেক সময় খবরের কাঠামোতে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যায়। ঘটনার কেন্দ্রীয় মানুষটি ধীরে ধীরে একজন ‘মানুষ’ থেকে একটি ‘ঘটনা’ হয়ে যান।

একজন নারীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘নির্যাতনের শিকার নারী’ হিসেবে। একজন শিশুকে বলা হয় ‘নির্যাতিত শিশু’। কোনো নারীকে বলা হয় ‘স্বামীর ঘর থেকে বিতাড়িত’। কোনো কিশোরীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো ঘটনা দিয়ে। অথচ তার আরও অনেক পরিচয় থাকতে পারে।

সে একজন শিক্ষার্থী হতে পারে। সে একজন মা হতে পারে। সে একজন উদ্যোক্তা হতে পারে। সে একজন শ্রমিক হতে পারে। সে হয়তো পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। তার হয়তো নিজের স্বপ্ন আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে। একটি মানুষকে তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের ঘটনাটি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা কি ন্যায্য? সাংবাদিকতার ভাষায় এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংবাদমাধ্যম যদি কোনো ব্যক্তির পরিচয়কে শুধু তার ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, তাহলে সমাজও তাকে সেভাবেই দেখতে শেখে।

‘ভুক্তভোগী’ থেকে ‘অধিকারসম্পন্ন মানুষ’
সহিংসতার সংবাদে সাধারণত মানুষের আবেগ দ্রুত কাজ করে। একটি হৃদয়বিদারক ছবি, একটি কান্নার দৃশ্য কিংবা একটি শিশুর অসহায় মুখ পাঠকের মনোযোগ টেনে নেয়। কিন্তু সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য কি শুধু পাঠকের আবেগ তৈরি করা? নাকি সেই আবেগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্নে পরিণত করা?

ধরা যাক, একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার ছবি প্রকাশ করে হাজার মানুষকে কাঁদানো খুব সহজ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্ন তোলা, শিশুটি কেন নিরাপদ ছিল না? তার সুরক্ষার দায়িত্ব কার? অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা ছিল কি? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কী করেছে? শিশুটির শিক্ষা ও মানসিক সুস্থতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেদন তাই শুধু ঘটনার ভয়াবহতা দেখাবে না; ঘটনার পেছনের কাঠামোগত সমস্যাও তুলে ধরবে। এখানেই সংবাদ ‘গল্প’ থেকে ‘সামাজিক দলিল’ হয়ে ওঠে। একই বিষয় নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন নারী নির্যাতনের শিকার হলে প্রশ্ন শুধু ‘কী হয়েছিল’ নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, তিনি কোথায় সহায়তা পাবেন? তার আইনি অধিকার কী? নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? একই পরিস্থিতিতে অন্য নারীরা কিভাবে সুরক্ষা পেতে পারেন? অর্থাৎ, সাংবাদিকতার দৃষ্টি ব্যক্তি থেকে ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে।

একটি ছবিও কখনো কখনো একটি প্রশ্ন
লিখিত ভাষার মতো ছবিরও ভাষা আছে। একজন নারীকে নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে তার কান্নার ছবি ব্যবহার করা হলো। আরেকটি প্রতিবেদনে তাকে দেখা গেল নিজের কাজ করছেন, কথা বলছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দুই ছবিই হয়তো সত্য। কিন্তু কোন ছবিটি তাকে কিভাবে উপস্থাপন করছে?

প্রথম ছবিটি পাঠকের মধ্যে করুণা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়টি তাকে সক্ষম ও সক্রিয় একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। তাই জেন্ডার-সংবেদনশীল সাংবাদিকতা শুধু শব্দের বিষয় নয়। ছবি, ভিডিও, ক্যাপশন, শিরোনাম, থাম্বনেইল সবকিছুর মধ্যেই এর প্রতিফলন থাকতে হয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি।

একজন শিশুর পরিচয়, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সাংবাদিককে ভাবতে হবে, এই তথ্য আজ সংবাদ হিসেবে আকর্ষণীয় হলেও আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর এর প্রভাব কী হতে পারে? শিশুর বর্তমান নিরাপত্তার পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ মর্যাদাও সাংবাদিকতার বিবেচনায় থাকতে হবে।

নারীকে শুধু ‘শক্তিশালী’ বললেই কি গল্পটি জেন্ডার-সংবেদনশীল হয়?
এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। অনেক সময় আমরা নারীকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করি, যা অজান্তেই প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালী করে। ‘সংসার সামলে সফল নারী’, ‘স্বামীর সহযোগিতা ছাড়াই সফল’, ‘পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সফল’ এ ধরনের বাক্য শুনতে ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকে যায়: কেন একজন নারীর সাফল্যকে বারবার পুরুষের সঙ্গে তুলনা করে ব্যাখ্যা করতে হবে? একজন পুরুষ উদ্যোক্তাকে আমরা সাধারণত ‘পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সফল উদ্যোক্তা’ বলি না। তাহলে নারীর ক্ষেত্রেই কেন?

জেন্ডার-সংবেদনশীল ভাষা মানে নারীর প্রতিটি সাফল্যকে অতিরিক্ত প্রশংসার মোড়কে ঢেকে দেওয়া নয়। বরং তাকে তার দক্ষতা, কাজ, সিদ্ধান্ত ও অর্জনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। একজন নারী চিকিৎসক একজন চিকিৎসক। একজন নারী প্রকৌশলী একজন প্রকৌশলী। একজন নারী উদ্যোক্তা একজন উদ্যোক্তা। তার নারী পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে যদি সেই পরিচয় তার কাজের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। কিন্তু সেটিই যেন তার একমাত্র পরিচয় না হয়ে যায়।

অন্তর্ভুক্তি: যাদের কণ্ঠ সবচেয়ে কম শোনা যায়
একটি সংবাদে পাঁচজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য থাকতে পারে। কিন্তু যে মানুষটির জীবনে সমস্যাটি প্রতিদিনের বাস্তবতা, তার বক্তব্য নেই। তাহলে কি গল্পটি সম্পূর্ণ? সম্ভবত নয়। ঢাকার একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী নারীর বাস্তবতা আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন নারী কৃষিশ্রমিকের বাস্তবতা এক নয়।

একজন প্রতিবন্ধী নারীর কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতা অন্য নারীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। একজন একক মায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও আলাদা। তাই ‘নারী’কে একটি একক, অভিন্ন পরিচয় হিসেবে দেখলে সমাজের বহু বাস্তবতা অদৃশ্য থেকে যায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিকতা সেই অদৃশ্য মানুষদের দৃশ্যমান করে। যে নারী কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তাকে সম্মানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া।

যে শ্রমজীবী নারী হয়তো টেলিভিশনের স্টুডিওতে আসতে পারবেন না, তার কর্মস্থলে গিয়ে কথা শোনা। যে প্রান্তিক মানুষটি প্রচলিত ভাষায় নিজের অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে পারেন না, তার কথাকে নিজের মতো করে ‘সাজিয়ে’ না দিয়ে তার বক্তব্যের অর্থ অক্ষুণ্ন রাখা। এগুলোই অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রয়োগ।

ন্যায়বিচার মানে কারও হয়ে কথা বলা নয়, তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া
সাংবাদিকতার একটি বড় শক্তি হলো, এটি ক্ষমতাহীন মানুষের কণ্ঠকে বৃহত্তর সমাজের সামনে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু এখানে একটি সীমারেখা আছে। সাংবাদিক কোনো ব্যক্তির হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন না। বরং তাকে নিজের কথা বলার জায়গা তৈরি করে দেবেন।

একজন নারী যদি বলেন, তিনি কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু তার অভিযোগ প্রকাশ করা নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কী বলছে, নীতিমালা কী বলছে, তথ্য-প্রমাণ কী বলছে—সবই যাচাই করতে হবে। কারণ ন্যায়বিচার মানে কাউকে আগে থেকেই দোষী ঘোষণা করা নয়। আবার ‘দুই পক্ষের বক্তব্য’ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।

যদি একটি পক্ষের কাছে ক্ষমতা, অর্থ ও প্রতিষ্ঠান থাকে এবং অন্য পক্ষের কাছে শুধু নিজের অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে সাংবাদিককে সেই ক্ষমতার পার্থক্যটিও বুঝতে হবে। ন্যায়বিচার মানে তাই ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতা কিন্তু এমন ভারসাম্য নয়, যেখানে সত্য ও মিথ্যাকে সমান ওজন দেওয়া হয়।

পরিবর্তন শুরু হয় প্রশ্ন থেকে
একটি ভালো ফিচার সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলো পাঠককে নিজের জীবনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। আমাদের ঘরে সিদ্ধান্ত কে নেয়? মেয়েশিশুর পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন সহজ হয়ে যায়? একজন নারী চাকরি করলে কেন তার পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কিন্তু একজন পুরুষ চাকরি করলে একই প্রশ্ন সবসময় ওঠে না?

কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি শুধু নারীর? একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়ার বদলে আমরা কেন প্রায়ই তার ‘অক্ষমতা’ নিয়ে কথা বলি? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু সংবাদমাধ্যমের কাছে নেই। কিন্তু সংবাদমাধ্যম প্রশ্নগুলোকে দৃশ্যমান করতে পারে। আর প্রশ্ন দৃশ্যমান হলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা
একজন সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা আছে, মাইক্রোফোন আছে, কলম আছে, এখন আছে অসীম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও। কিন্তু তার হাতে আরও একটি শক্তিশালী জিনিস আছে, মানুষের গল্প বলার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা দিয়ে একজন মানুষকে অপমান করা যায়। আবার তার মর্যাদাও রক্ষা করা যায়। একটি শিশুর কান্নাকে ‘কনটেন্ট’ বানানো যায়। আবার তার নিরাপত্তার প্রশ্নকে জাতীয় আলোচনায় আনা যায়। একজন নারীর পোশাক নিয়ে আলোচনা করা যায়। আবার তার শ্রম, অধিকার ও অর্জন নিয়ে আলোচনা করা যায়। কোন পথটি বেছে নেওয়া হবে, সেটিই সাংবাদিকতার নৈতিক পরীক্ষা। কারণ সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিক হয়তো পরের ঘটনায় চলে যাবেন। কিন্তু যার গল্প প্রকাশিত হয়েছে, তাকে সেই গল্প নিয়েই সমাজের মধ্যে বাঁচতে হবে।

আমাদের গল্পগুলো কেমন হবে?
সমাজ বদলানোর আগে গল্প বদলায়। আর গল্প বদলানোর আগে বদলাতে হয় গল্প বলার দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা এমন সংবাদ চাই, যেখানে নারী শুধু ‘ভুক্তভোগী’ নন, তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। যেখানে শিশু শুধু ‘অসহায়’ নয়, সে অধিকারসম্পন্ন একজন মানুষ। যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শুধু ‘সহানুভূতির পাত্র’ নন, তিনি সক্ষম নাগরিক। যেখানে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ কোনো ‘অতিরিক্ত বক্তব্য’ নয়, মূল গল্পের অংশ। যেখানে জেন্ডার-সংবেদনশীল ভাষা কোনো আলাদা নিয়মের তালিকা নয়, সাংবাদিকতার স্বাভাবিক নৈতিকতা। এবং যেখানে ন্যায়বিচারের কথা বলতে গিয়ে কাউকে ছোট করা হয় না, কারও ব্যক্তিগত কষ্টকে বিনোদনে পরিণত করা হয় না। কারণ শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম শুধু আমাদের বলে না, কী ঘটেছে। সংবাদমাধ্যম অনেক সময় আমাদের শেখায়, কীভাবে ঘটনাটিকে দেখতে হবে। সেই দেখার জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শব্দেরও একটি পক্ষ থাকে। একটি ছবিরও একটি পক্ষ থাকে। একটি শিরোনামেরও একটি পক্ষ থাকে। তাই প্রতিবার কোনো নারী, শিশু কিংবা প্রান্তিক মানুষের গল্প লিখতে বসার আগে সাংবাদিকের নিজের কাছেই একটি প্রশ্ন থাকা দরকার, ‘আমি কি তার গল্প বলছি, নাকি তার জায়গায় দাঁড়িয়ে তার হয়ে একটি গল্প বানিয়ে ফেলছি?’ এই প্রশ্নের উত্তর যদি আমাদের থামিয়ে দেয়, আরও একবার ভাবতে বাধ্য করে, শব্দ বাছাই করতে শেখায়, ছবি নির্বাচনে সতর্ক করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মানুষটির মর্যাদাকে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনে, তাহলেই সাংবাদিকতা তার সবচেয়ে মানবিক শক্তিকে ফিরে পায়। কারণ একটি ভালো সংবাদ শুধু পাঠককে জানায় না।

একটি ভালো সংবাদ মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই হয়তো একটি ন্যায্য, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের সবচেয়ে নীরব কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী ‘শুরু’।

লেখক: এস এম নাজমুল হক ইমন, সিনিয়র রিপোর্টার, আউটলুক বাংলা




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD