সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে স্কেল আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত করেছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আংশিকভাবে বর্ধিত বেতন কার্যকর হবে। এ জন্য আগামী বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন খাতে চলতি বাজেটের চেয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে এ খাতে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সচিবালয়ে গত ১৩ ও ১৪ মে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটসংক্রান্ত দুটি বৈঠকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে নীতিগত সম্মতি দিয়েছেন।
অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নবম জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। কমিশনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সরকার গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি তা আংশিক সংশোধন করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। সেই অনুযায়ী আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা প্রথম দুই অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে দেওয়া হবে। তৃতীয় অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করা হবে।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা যে ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন, সেটি নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশে পে কমিশনের প্রস্তাবিত ভাতার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সচিব ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গাড়ি, কুক ও মালি ভাতা অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি।
নবম পে কমিশনের প্রস্তাবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। এতে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন কাঠামো তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু নতুন সুবিধার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ উল্লেখযোগ্য।
কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। এতে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং এর নিচের বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। সামরিক বাহিনী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। তারা বর্তমানে ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। দীর্ঘ এক দশক পর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটি এ বিষয়ে চূড়ান্ত বৈঠকে বসবে। সেখানেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে। সব মিলিয়ে আগামী জুলাই থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আংশিক বর্ধিত বেতন পাওয়া শুরু করবেন। সমকাল