স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবার নির্দলীয় পদ্ধতিতে আয়োজনে আইন সংশোধন হলেও নিজেদের সমর্থিত প্রার্থী ঘোষণা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে অধিকাংশ জায়গায় দলসমর্থিত প্রার্থী ঠিক করেছে। প্রকাশ্যেই প্রার্থী ঘোষণা করছে এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল। যদিও এই দলগুলোর দাবি ছিল, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে করার।
সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে হবে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, এক বছরের মধ্যে সব নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় সরকার। কোন নির্বাচন আগে আর কোনটা পরে হবে, তা নির্ভর করবে বাজেট প্রাপ্তির ওপর।
নির্দলীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ঘোষণায় উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য চিন্তার। আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে।’
বিএনপি ছাড়া বড় দলগুলোর সবাই দলসমর্থিত প্রার্থী ঠিক করছে। দ্রুত স্থানীয় নির্বাচনের জন্য চাপ দেওয়া জামায়াত বলেছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। দলের প্রস্তুতির জন্য নাম বাছাই করছে। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, তপশিলের পর তারা দলসমর্থিত প্রার্থী ঠিক করবে। আর এনসিপিসহ অন্যান্য দলগুলোর ভাষ্য, দলীয় প্রার্থী নয়, কাকে সমর্থন দেওয়া হবে, তা ঘোষণা করা হচ্ছে। যদিও এনসিপির দলীয় ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে কয়েক দিন ধরেই দলসমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান এবং পৌর মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। এর আগে সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ সিটি করপোরেশনে দলসমর্থিত মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়।
চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে দলসমর্থিত নাম ঘোষণা করেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতার কারণেই দাবি ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে করতে হবে। যাতে সংঘাত ও প্রভাব বিস্তার না থাকে, আগের মতো উৎসবমুখর হয়। রাজনৈতিক দলগুলো এভাবে প্রার্থী ঘোষণা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগের নির্দলীয় চরিত্র ফিরে পাবে না। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিলের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হবে।
২০১৫ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় পদ্ধতিতে হয় স্থানীয় নির্বাচন। তবে ১৯৯৪ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রভাব শুরু হয়। যা পরের বছরগুলোতে আরও বৃদ্ধি পায়।
দলীয় নির্বাচনে রক্তাক্ত ভোট
আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান করা হয়। এতে স্থানীয় নির্বাচন উৎসব থেকে সংঘাতে পরিণত হয়।
তখন সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রশাসনের পক্ষপাত এবং বিনা ভোটে জয়ী হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সরকারি দলের মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হতো। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ১৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। এটি ছিল বাংলাদেশে নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত ভোট।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও স্বতন্ত্রদের সংঘর্ষে ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে দেশজুড়ে ১১৩ জন নিহত হয়েছিলেন।
সুজনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় স্থানীয় নির্বাচনেও মনোনয়ন বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। আওয়ামী লীগের এমপি এবং নেতাদের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন বিক্রির বিস্তর অভিযোগ ওঠে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতারা স্বীকার করেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোট করা ভুল ছিল।
বিনা ভোটে জয়ের রেকর্ড
২০১৯ সালে ৪৪০টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ১০৮টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাদের সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। সেই নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পেয়েও নির্বাচনের মাঠে টিকতে পারেননি।
২০২১ সালে অষ্টম ইউপি নির্বাচনের প্রথম পাঁচ ধাপেই তিন হাজার ৭৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদের ৩৪৮টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ওই নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থীরা মামলা-হামলায় টিকতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২০ ও ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ৩৩০ পৌরসভার ১২টিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে নজির তৈরি হয়েছিল সিটি করপোরেশনেও। ২০১৯ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপির বর্জন করা ওই নির্বাচনে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা শেষ সময়ে সরে যান। স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয় সমর্থকের ভুল স্বাক্ষরের অভিযোগে।
প্রতীক বাদ গেলেও দলগুলো জড়িয়েছে ভোটে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের কাছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সব দলের প্রস্তাব ছিল– স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে হবে। জুলাই সনদেও একই প্রস্তাব রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাদ দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে। এই চারটি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে বিএনপি সরকার।
সংসদ নির্বাচনের পর সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত, এনসিপি জোট স্থানীয় সরকারে দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে।
কেন্দ্রীয়ভাবে না হলেও স্থানীয় জামায়াত মেয়র পদে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ড. মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান, রংপুরে এ টি এম আজম খান, চট্টগ্রামে মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালী এবং নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বারের নাম ঘোষণা করেছে।
সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত নেতারা নিশ্চিত করেছেন, মেয়র পদের জন্য জেলা আমির হাবিবুর রহমান, মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং জেলার নায়েবে আমির লোকমান আহমদের নাম কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বাছাই করা হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর আমির মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিন ও দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম আলোচনায় রয়েছে। ঢাকায় জামায়াতের পদধারী নেতারা দলীয় সমর্থিত প্রার্থী পরিচয়ে কাউন্সিলর পদের জন্য প্রচার চালাচ্ছেন। জামায়াত স্থানীয়ভাবে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থীও ঠিক করেছে, যারা ভোটে প্রচার চালাচ্ছেন।
নির্দলীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দিলে অতীতের ধারা থেকে বের হওয়া যাবে কিনা– প্রশ্নে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাদের বলেছেন, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবেই হবে। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও ভোটার। তাদের যাঁকে ভালো লাগে, তাঁকে ঐক্যবদ্ধভাবে সমর্থন দেবেন। নির্দলীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষে জামায়াতেরই প্রস্তাব ছিল, জামায়াত তাতেই রয়েছে। ২০১৫ সালের আগে স্থানীয় নির্বাচনে দলের ভূমিকা যেমন স্থানীয়ভাবে সমর্থন জানানোতে সীমাবদ্ধ ছিল, আগামীতেও তাই থাকবে।
এনসিপি পাঁচ সিটি করপোরেশন এবং ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় দল-সমর্থিত প্রার্থী ঘোষণা করেছে সবার আগে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা উত্তরে সমর্থিত প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে দলের ভূমিকা সমর্থনে সীমাবদ্ধ থাকবে। নেতাকর্মীদের প্রস্তুতির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে প্রার্থীদের প্রচারের মাধ্যমে দলের কাজও হয়। সমকাল