দেশের যেসব এলাকায় প্রচলিত সেলুলার নেটওয়ার্কের কাভারেজ নেই, সেখানে স্যাটেলাইটভিত্তিক ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডি-টু-সি) মোবাইল সেবা পরীক্ষার জন্য বাংলালিংককে অনুমতি দিয়েছে সরকার। এর ফলে স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল সংযোগের উদীয়মান বৈশ্বিক প্রযুক্তির তালিকায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলো।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি ১২ মে জারি করা এক সরকারি আদেশে জানানো হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রস্তাবে এ অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, অনুমোদনের তারিখ থেকে দুই মাস মেয়াদে ‘প্রুফ অব কনসেপ্ট’ (পিওসি) হিসেবে পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রম চালানো যাবে।
সংযোগ বিহীন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট অরবিট (এনজিএসও) কাঠামোর অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক স্টারলিংকের সহযোগিতায় বাংলালিংক এই পরীক্ষামূলক সেবাটি পরিচালনা করবে।
অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তায়েমুর রহমান বাসসকে জানান, সারাদেশে জুন মাস জুড়ে স্টারলিংক-সমর্থিত এই পরীক্ষামূলক সেবা চালানো হবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলালিংক প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ডি-টু-সি সংযোগ চালু করতে যাচ্ছে, যা পার্বত্য এলাকা, চর, উপকূলীয় দ্বীপ ও সমুদ্র উপকূলের বাইরে থাকা অঞ্চলের কাভারেজ ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে।’
তিনি আরও বলেন, স্যাটেলাইট সংযোগ মোবাইল নেটওয়ার্কের পরিপূরক ভূমিকা রাখবে, বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যোগাযোগে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর এ সেবা বাংলাদেশজুড়ে কাভারেজ দেবে, এমনকি বঙ্গোপসাগরের ২২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যাতে গভীর সমুদ্রে থাকা জেলেরা উপকূলীয় নেটওয়ার্ক এলাকার বাইরে থেকেও সংযুক্ত থাকতে পারেন।’
প্রাথমিকভাবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগের মাধ্যমে ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং সেবা চালু হবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি আদেশে বলা হয়, এ অনুমতি কেবল পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য প্রদান করা হয়েছে; এটি কোনোভাবেই ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিটিআরসি পরীক্ষার সব প্রযুক্তিগত, কার্যক্রমগত ও বিধিনিষেধ সংক্রান্ত দিক পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে বলেও আদেশে উল্লেখ রয়েছে।
অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী, পিওসি চলাকালে বিটিআরসি অনলাইন ও অফলাইন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এতে ট্রাফিক, সিগন্যালিং, অথেনটিকেশন, স্পেকট্রাম ব্যবহার-সবকিছুই বাংলালিংকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তদারকি করা হবে।
এছাড়া পিওসি চলাকালে ডি-টু-সি সুবিধা বাংলালিংকের মোবাইল অপারেটর কাঠামোর একটি সম্পূরক সেবা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর সমস্ত অপারেশনাল দায়-দায়িত্ব অপারেটরের ওপরই বর্তাবে।
অস্থায়ী ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলালিংকের জন্য বরাদ্দ ১৯২০-১৯২৫ মেগাহার্টজ এবং ২১১০-২১১৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিশেষ বিবেচনায় পিওসি চলাকালে স্টারলিংক নেটওয়ার্কে সীমিত আকারে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি ভবিষ্যতে স্পেকট্রাম মালিকানা, স্থানান্তর বা যৌথ ব্যবহারের কোনো নজির হিসেবে বিবেচিত হবে না এবং পিওসি শেষে অনুমতিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।
পিওসি চলাকালে সীমিত ব্যবহারযোগ্য একটি অস্থায়ী পিএলএমএন কোড বাংলালিংককে দেওয়া হবে, যা পরীক্ষার সময়সীমা শেষে বাতিল হয়ে যাবে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে যে, সেবাটিকে অবশ্যই দেশের আইনসম্মত আড়িপাতার কাঠামোর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সঙ্গতিপূর্ণ থাকতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর চাওয়া তথ্য সরবরাহ করার জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
পিওসি চালুর আগে বাংলালিংক ও স্টারলিংকের মধ্যে সম্পাদিত বিস্তারিত চুক্তিপত্র বিটিআরসিতে জমা দিতে হবে বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
শর্ত অনুযায়ী, ডি-টু-সি সেবা কেবল সেইসব স্থানে কাজ করবে যেখানে কোনো স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। আর সাধারণ সেলুলার কাভারেজ পাওয়া গেলে গ্রাহকের ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রচলিত নেটওয়ার্কে ফিরে যাবে।
পরীক্ষামূলক সময়ে জাতীয় নেটওয়ার্ক কাঠামো, আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে এবং বিটিআরসির সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
বিশ্বব্যাপী স্যাটেলাইট-টু-মোবাইল বা ডি-টু-সি প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যেই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ বিশেষ করে দুর্গম, সামুদ্রিক, দুর্যোগপ্রবণ ও ভৌগোলিকভাবে চ্যালেঞ্জিং এলাকায় সংযোগ বিস্তারে গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউক্রেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে স্টারলিংক ও টেলিকম অপারেটররা জরুরি যোগাযোগ, দুর্গম এলাকা কাভারেজ ও সামুদ্রিক সংযোগের জন্য পরীক্ষামূলক প্রকল্প ও অংশীদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেন ও কাজাখস্তানের পর বাংলাদেশ হতে চলেছে ভিওন (নেদারল্যান্ডসের টেলিযোগাযোগ কোম্পানি) এর তৃতীয় বাজার, যেখানে এই প্রযুক্তি চালু করা হবে। ভিওন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনে সেবাটি চালু হওয়ার পর থেকে পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি স্বতন্ত্র ব্যবহারকারী স্টারলিংক মোবাইল স্যাটেলাইটের সাথে সংযুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজাখস্তানে সফল পরীক্ষা চালানো হয়, যার মধ্যে স্টারলিংক স্যাটেলাইট সংযোগ ব্যবহার করে মধ্য এশিয়ার প্রথম হোয়াটসঅ্যাপ কলও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি প্রচলিত স্থলভিত্তিক টেলিকম নেটওয়ার্কের প্রতিস্থাপন হিসেবে নয়, বরং একটি পরিপূরক স্তর হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, বিশেষ করে অনুন্নত এবং দুর্গম অঞ্চলগুলোর জন্য।
বাংলাদেশের উদ্যোগটিকে উপকূলীয় সংযোগ ও দুর্যোগ-সহনশীলতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ দেশের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চল ও বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক সামুদ্রিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থার বাইরে ছিল।