প্রথম ইনিংস শেষে মাঠ ছাড়ার সময় বেশ উৎফুল্ল দেখাল বাংলাদেশ দলকে। খুনসুটি, মজা করছিলেন সবাই। প্রতিপক্ষ গুটিয়ে গেছে দেড়শর কমে। নাহিদ রানা গড়েছেন দেশের সেরা বোলিংয়ের কীর্তি। এমন ফুরফুরেই থাকারই কথা সবার। কে জানত, ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন তাদের অপেক্ষায়!
বাজে ব্যাটিংয়ের মহড়ায় বাংলাদেশই ডেকে আনল সেই বিভীষিকা। একের পর এক ব্যাটসম্যান আত্মঘাতী শটে উইকেট বিলিয়ে দিলেন অকাতরে। স্রেফ ১৪১ রানের পুঁজি নিয়েও দারুণ এক জয়ে সিরিজে এগিয়ে গেল জিম্বাবুয়ের।
তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে সোমবার বাংলাদেশকে ২৫ রানে হারাল জিম্বাবুয়ে।
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়ে ২১ রানে ৬ উইকেট নেন নাহিদ। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার বিফলে যায় তার কীর্তি।
জিম্বাবুয়ে যে শেষ পর্যন্ত এত রান তুলতে পারল, সেটাও ছিল বিস্ময়কর। এক পর্যায়ে তাদের রান ছিল ৮ উইকেটে ৭০! কিন্তু পরের দুই জুটিতে ৭১ রান যোগ করে তারা। শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠে ম্যাচের প্রেক্ষাপটে মহামূল্য।
জিম্বাবুয়ের কোনো বোলার ৪-৫ উইকেট পাননি। তবে চার পেসার মিলেই ১১৬ রানে শেষ করে দেন বাংলাদেশের ইনিংস। আর কোনো বোলারকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনই পড়েনি তাদের।
হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠের উইকেটে ছিল সবুজ ঘাস। বাউন্স ছিল অনেক। তবে খুব ভয়ঙ্কর কিছু নয়, লক্ষ্যও তো ছিল ছোট। বাংলাদেশের ব্যাটিংই মুখ থুবড়ে পড়েছে বাজেভাবে।
৯ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নেমে দলের সর্বোচ্চ ৩৩ রান করার পর বল হাতে দুটি উইকেট নেন তরুণ নিউম্যান নিয়ামুরি। সঙ্গে দুটি ক্যাচ নিয়ে ম্যান অব দা ম্যাচ ২০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। দশে নেমে ২৭ রান করার পর ৩টি উইকেট নেন অধিনায়ক রিচার্ড এনগারাভা। ব্লেসিং মুজারাবানি ও ব্র্যাড ইভান্স ভাগাভাগি করে নেন বাকি পাঁচ উইকেট।
অথচ ম্যাচের মাঝবিরতিতে টিভি সাক্ষাৎকারে তাসকিন আহমেদ বলেন, শুরুর তুলনায় উইকেট বেশ ভালো হয়ে উঠেছে।
কিন্তু বাংলাদেশের রান তাড়ার শুরুটা হয়নি ভালো। ব্লেসিং মুজারাবানির বলে তানজিদ হাসানের শট ছক্কা হওয়ার পথে ছিল, সেটিকে ক্যাচে পরিণত করেন নিয়ামুরি।
মুজারাবানির পরের ওভারেই নাজমুল হোসেন শান্ত উড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন সামনে। ব্যাটের কানায় লেগে বল যায় পেছনে। ধরা পড়েন তিনি থার্ডম্যানে। পরের ওভারে এনগারাভাবে আপার কাট করে উইকেট বিলিয়ে দেন সৌম্য সরকার।
চতুর্থ উইকেটে চোয়ালবদ্ধ লড়াইয়ে জুটি গড়ে তোলেন নুরুল হাসান সোহান ও তাওহিদ হৃদয়। বলের পর বল ছেড়ে দিয়েছেন হৃদয়। ১৫ ওভার শেষে তার রান ছিল ৪১ বলে ১০। সোহান ক্রিজে যাওয়ার পর একটি ছক্কা মারলেও পরে গুটিয়ে যান।
তবে হৃদয় একটা পর্যায়ে ধৈর্য হারিয়েই ফেলেন। উইকেট ছুড়ে আসেন তিনি (৫৮ বলে ২৫) নিয়ামুরিকে স্ল্যাশ করে। একটু পর আরও বাজে শটে বিদায় নেন মোসাদ্দেক হোসেন।
প্রয়োজনের সময় দলের দায়িত্ব নিতে পারেননি মেহেদী হাসান মিরাজ। একপ্রান্ত আগলে রাখা সোহান (৩১) আউট হন আম্পায়ারের সংশয়পূর্ণ সিদ্ধান্তে। এই সিরিজে নেই ডিআরএস। তার রক্ষার উপায় ছিল না।
লোয়ার অর্ডারে সেভাবে দাঁড়াতে পারেননি কেউ। ৩৩১. ওভারেই শেষ বাংলাদেশের ইনিংস।
ম্যাচের প্রথম ভাগে টস জিতে বোলিংয়ে নেমে তৃতীয় ওভারেই সুযোগ হাতছাড়া করে বাংলাদেশ। তাসকিন আহমেদের বলে পয়েন্টে ব্রায়ান বেনেটের ক্যাচ নিতে পারেননি রিশাদ।
সুযোগ পেয়ে ভলো জুটি গড়ার আভাস দেন বেনেট ও বেন কারান। বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে বল হাতে নয়, ফিল্ডিং। মিড অফে দুর্দান্ত ডাইভিং থ্রোয়ে রান আউট করেন দেন বেন কারানকে (১৮)।
সেই উইকেটই খুলে দেয় আরও সাফল্যের দুয়ার। ৮ রানে জীবন পাওয়া বেনেট ১৭ রানে তাসকিনের বলেই ক্যাচ দেন পয়েন্টে। অভিজ্ঞ এই পেসারের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে কিছুই বুঝতে না পেরে বোল্ড হন ক্রেইগ আরভিন।
চাপে থাকা জিম্বাবুয়েকে আরও কোণঠাসা করতে নাহিদকে আক্রমণে আনেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ফল মিলতে সময় লাগেনি বেশিক্ষণ।
রানা এসে রানের গতি চেপে ধরেন শুরুতে। এরপর ধরা দেয় একের পর এক উইকেট।
জায়গা বানিয়ে রান করার চেষ্টায় উইকেটের পেছনে ক্যাচ সিকান্দার রাজা। গতি আর বাউন্স সামলাতে পারেননি ওয়েসলি মাধেভেরে। পয়েন্টে ধরা পড়েন ক্লাইভ মাডান্ডে।
সৌম্য সরকারকে চার ও ছক্কা মেরে পাল্টা আক্রমণের আভাস দেন ইনোসেন্ট কাইয়া। কিন্তু তার পতন ডেকে আনে নাহিদের বাড়তি বাউন্সি। ওই ওভারে ইভান্সকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন ৫ উইকেট।
মাত্র ১৪ ওয়ানডের ক্যরিয়ারের ৩ বার ম্যাচে ৫ উইকেট পেয়ে গেলেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে তার চেয়ে কম ম্যাচ খেলে এটি করতে পেরেছেন কেবল মুস্তাফিজুর রহমান (৯ ম্যাচ)।
নাহিদের প্রথম স্পেল ছিল ৭-২-১৫-৫।
জিম্বাবুয়ে ৮ উইকেট হারায় ৭০ রানে। বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান নেই একজন। সেই ধ্বংসস্তূপেই প্রতিরোধ গড়েন নিয়ামুরি ও এনগারাভা। দুজনেই মূলত বাঁহাতি পেসার, তবে লড়াই করেন ব্যাট হাতে।
একশ তখনও অনেক দূরের পথ। তবে এই জুটি দারুণ খেলে দলকে ১৩০ পার করে নিয়ে যায়। নাহিদ আক্রমণ থেকে সরে যাওয়ায় একটু স্বস্তিও পান তারা। স্পিনে বেশ কিছু বাউন্ডারি আদায় করেন দুজন।
নাহিদ দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে ৬৩ রানের এই জুটি ভাঙেন। ২৭ রান করে বোল্ড হন এনগারাভা।
নাহিদের সামনে তখন সাত উইকেটের হাতছানি। তবে তার শেষ ওভার কোনোরকমে পার করে দেয় জিম্বাবুয়ের শেষ জুটি। ৩৩ রান করা নিয়ামুরিকে ফিরিয়ে মিরাজ শেষ করে দেন ইনিংস।
তখনও ভাবা যায়নি, এই ম্যাচ হারতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু মিরাজ হেরে গেলেন বেশ পরিষ্কার ব্যবধানেই।
সিরিজের পরের ম্যাচ বৃহসস্পতিবার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
জিম্বাবুয়ে: ৩৬.৪ ওভারে ১৪১ (বেনেট ১৭, কারান ১৮, কাইয়া ২৬, আরভিন ০, রাজা ১, মাধেভেরে ০, মাডান্ডে ২, ইভান্স ৩, নিয়ামুরি ৩৩, এনগারাভা ২৭, মুজারাবানি ৪*; তাসকিন ৭-১-৩২-২, মুস্তাফিজ ৬-০-১৯-০, নাহিদ ১০-২-২১-৬, সৌম্য ৩-০-১৭-০, রিশাদ ৫-০-২৭-০, মিরাজ ৫.৪-০-২২-১)
বাংলাদেশ: ৩৩.১ ওভারে ১১৬ (তানজিদ ৮, সৌম্য ৬, শান্ত ৩, হৃদয় ২৫, সোহান ৩১, মোসাদ্দেক ৩, মিরাজ ১০, রিশাদ ৩, তাসকিন ৫, মুস্তাফিজ ৫, নাহিদ ৫*; এনগারাভা ৭.১-১-৩১-৩, মুজারাবানি ১০-১-২৪-২, ইভান্স ১০-২-৩৪-৩, নিয়ামুরি ৬-২-২২-২)।
ফল: জিম্বাবুয়ে ২৫ রানে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে জিম্বাবুয়ে ১-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: নিউম্যান নিয়ামুরি।