রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটিকে টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস হিসেবে ধরা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘টাইপ ৫’ ডায়াবেটিস।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে এ ধরনের ডায়াবেটিসের সৃষ্টি হতে পারে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনো এটিকে পৃথক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
গবেষকদের ধারণা, বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এ ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। কিন্তু রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ায় অনেকেই ভুল চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের গ্লোবাল ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মেরেডিথ হকিন্স বলেন, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে না পারা একটি বড় বৈশ্বিক সমস্যা। ভুলবশত অনেক রোগীকে ইনসুলিন দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
টাইপ ১, টাইপ ২ ও টাইপ ৫-এর পার্থক্য
টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়, ফলে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না।
অন্যদিকে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস দীর্ঘদিনের অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদিত হয় না। একই সঙ্গে এসব রোগী ইনসুলিনের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হতে পারেন। ফলে প্রচলিত চিকিৎসা অনেক সময় কার্যকর হয় না, বরং ক্ষতিকর হতে পারে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রার ইনসুলিনও হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে।
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস থেকেও অন্ধত্ব, কিডনি বিকল হওয়া, স্নায়ুর ক্ষতি এবং দীর্ঘদিনেও ক্ষত না শুকানোর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কম ওজনের তরুণদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় অনেক সময় ভুল করে এটিকে টাইপ ১ ডায়াবেটিস হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
যেসব উপসর্গে সতর্ক হবেন
টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের উপসর্গ অনেকটাই অন্যান্য ধরনের ডায়াবেটিসের মতো। এর মধ্যে রয়েছে—
* অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগা
* ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া
* দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
* সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা
* মুখ শুকিয়ে যাওয়া
* ঝাপসা দেখা
* অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা
* শরীর কাঁপা বা দুর্বল অনুভব করা
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে ভুল করে টাইপ ২ হিসেবে চিকিৎসা করা হলে রোগীর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে টাইপ ৫ ডায়াবেটিস তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এর প্রধান কারণ শৈশবের দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশেও কম ওজনের মানুষের মধ্যে এ ধরনের ডায়াবেটিস বাড়ছে। ২০২৩ সালে ডায়াবেটিস কেয়ার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্থূল নন এমন মানুষের মধ্যেও তথাকথিত ‘লিন ডায়াবেটিস’-এর হার বাড়ছে।
লন্ডনের বাসিন্দা সোফিয়া শেয়ারার এমনই একজন রোগী। ২৩ বছর বয়সে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা পড়ে। তিনি জানান, শৈশব ও কৈশোরের দীর্ঘ সময় তিনি গুরুতর অপুষ্টি ও কম ওজনের সমস্যায় ভুগেছেন। ১৯ বছর বয়সে ওজন বাড়তে শুরু করার পর থেকেই নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।
তার ভাষায়, খুব দ্রুত ক্ষুধা লাগত, শরীর কাঁপত, মনে হতো যেন অজ্ঞান হয়ে যাব।
টাইপ ১ এবং বিরল জিনগত ডায়াবেটিসের সম্ভাবনা বাদ দেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাকে টাইপ ২ ডায়াবেটিস ক্লিনিকে পাঠান। পরে টাইপ ৫ নিয়ে গবেষণায় যুক্ত এক বিজ্ঞানী জানান, তার মধ্যে এ রোগের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে যুক্তরাজ্যে এখনো এ রোগ শনাক্তের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকায় নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস শনাক্তের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষার পদ্ধতি নেই। এ কারণেই রোগটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল।
১৯৮৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তবে ১৯৯৯ সালে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যের অভাবে সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে স্বীকৃতি দেয়। এ সিদ্ধান্তে দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত ৫০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, তাদের বর্তমান ডায়াবেটিস শ্রেণিবিন্যাস সব ধরনের রোগীর বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে না। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে পুনরায় শ্রেণিবিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইডিএফ-এর স্বীকৃতির ফলে রোগটি সম্পর্কে চিকিৎসকদের সচেতনতা বাড়বে এবং রোগীরা আরও উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ড. মেরেডিথ হকিন্স বলেন, প্রথমবারের মতো খুব শিগগিরই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের বহুল ব্যবহৃত ‘ডিগ্রুট’স এন্ডোক্রিনোলজি’ গ্রন্থে টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নিয়ে পৃথক অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে। এটি রোগটির সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
(যুগান্তর)