একসময় বলা হতো, সিলেট মানেই শান্তির তীর্থভূমি। অধ্যাত্মিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের যে ঐতিহ্যবাহী প্রদীপ জ্বলছিল এই পুণ্যভূমিতে, তার নিচেই যেন এখন জমাট বেঁধেছে গভীর অন্ধকার। হঠাৎ নয়-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সীমান্ত বাণিজ্য ঘিরে আর্থিক স্বার্থ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক স্থবিরতা এবং অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে সিলেট হয়েছে রক্তাক্ত। সুরমাপারের এই নগরে অপরাধের পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, সাধারণ মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীর ক্বীন ব্রিজ, বন্দরবাজার, আম্বরখানা, টিলাগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় পথচারী এবং যাত্রীদের জিম্মি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। ছিনতাইকারীদের বড় অংশই স্থানীয় কিছু সুবিধাবাদী নেতার ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে-সিলেট চলছে কার ইশারায়। এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ফাটল ধরেছে কাদের ইন্ধনে।
গত দুই বছরে সিলেটে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আছে রাজনৈতিক কোন্দল, সীমান্তবর্তী এলাকার বালু-পাথর কোয়ারির আধিপত্য, খাসজমি দখল এবং পারিবারিক ও সম্পত্তিগত বিরোধ। এ সময়ে সিলেটে বৃদ্ধি পেয়েছে চুরির ঘটনা। বিশেষ করে প্রবাসীদের খালি বাসাবাড়ি, বন্ধ দোকানপাট এবং রাতে আবাসিক এলাকায় চুরি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক এবং প্রবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোয় সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ৭ মে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রাম থেকে ৪ বছর বয়সি শিশু ফাহিমার লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল খুবই চাঞ্চল্যকর। সম্প্রতি নগরীতে ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাই বলে দেয় সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটুকু অবনতি হয়েছে। মার্চে আম্বরখানা ও জিন্দাবাজার এলাকার সশস্ত্র ছিনতাইয়ের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরেজমিন দেখা যায়, ভালো নেই আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট। প্রতি মুহূর্তেই নগরবাসীকে থাকতে হচ্ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। রাত নামলেই তাদের ঘিরে ধরছে নানা শঙ্কা। দিনের ব্যস্ত সড়কও মুহূর্তেই পরিণত হচ্ছে ছিনতাইকারীদের টার্গেটে। অস্ত্রের মুখে নগদ টাকা, মূল্যবান সামগ্রী, ব্যবসার মূলধনসহ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সর্বস্ব। কেবল ছিনতাইয়ের ঘটনাই নয়, সিলেট নগরজুড়ে একের পর এক হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মহানগর এলাকায় ২৪টি হত্যা, ৪৪ ধর্ষণ, ১৮৪ চুরি, ৮ ডাকাতি ও ৫৪ ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। এছাড়া রেকর্ডের বাইরে থেকে গেছে অনেক ঘটনা। আবার যেসব আলোচিত ঘটনা থানায় রেকর্ড হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে না গডফাদাররা। আড়ালেই থেকে যাচ্ছে মূল পরিকল্পনাকারীরা।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বড় বড় ছিনতাইয়ের ঘটনার তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে ও কাঙ্ক্ষিত পন্থায় পালন করছে না। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নগরীর হাউজিং এস্টেট ও সাগরদীঘির পাড় এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের পৃথক ঘটনা দুটি দেশজুড়ে ব্যাপক অলোচনার জন্ম দেয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি হাউজিং এস্টেট এলাকায় দিনের আলোয় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় থাকা নারীর সর্বস্ব লুটে নেওয়ার নেপথ্য নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরে। ৫ মার্চ সকালে সাগরদীঘির পাড় এলাকায় ফিল্মি স্টাইলে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর পথরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনায় রশিদ নামের একজন গ্রেফতার হলেও বাকিরা অধরা। গত বছরের ২৬ অক্টোবর কদমতলী এলাকায় এনা পরিবহণের এক ম্যানেজারের ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৫টি মোটরসাইকেলে ১০ জন অংশ নিয়েছিল। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
৮ মে বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইনের প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ৯ জনকে গ্রেফতার করা হলেও টাকা বহনকারী গাড়ি থামিয়ে সরাসরি অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা এবং টাকা লুটকারী কেউই ধরা পড়েনি। এখনো উদ্ধার হয়নি কোনো টাকা। এদিকে যাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করছেন। এ বিষয়ে বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইন বলেন, ‘পুলিশ বলছিল যে ধরা পড়েছে দুজন, কিন্তু তারা নাকি স্বীকার করছে না। কিন্তু আমরা তো ফুটেজ দিয়েছি। যে মোটরসাইকেলে নিয়ে যাচ্ছে, মোটরসাইকেলের নম্বরসহ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তারপরও ছিনতাইকারীরা ধরা পড়ছে না। কোনো টাকা উদ্ধার হচ্ছে না। আমরা বারবারই যোগাযোগ করছি; কিন্তু তারা বলছে, ‘দোয়া করেন, দোয়া করেন।’
৪ এপ্রিল দুপুরে সিলেট নগরীর আম্বরখানা এলাকা থেকে শাহী ঈদগাহ যাওয়ার পথে কলেজ প্রভাষক ও সাংবাদিকের শিশুপুত্রকে জিম্মি করে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার শিকার হন বালাগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের পরিচিত মুখ ওহী আলম রেজা এবং তার তিন বছর বয়সি শিশুপুত্র। সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভেতর হঠাৎ যাত্রীবেশী এক ছিনতাইকারী ধারালো ছুরি বের করে প্রভাষক ওহী আলম রেজার শিশুপুত্রের গলায় ধরে এবং চিৎকার করতে নিষেধ করে। সন্তানের গলায় ধারালো অস্ত্র দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সেই শিক্ষক বাবা। তিনি সন্তানকে আঁকড়ে ধরে রাখেন। এই সুযোগে ছিনতাইকারীরা তার পকেট তল্লাশি করে প্রায় ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতারের খবর পাওয়া যায়নি। ১৩ মার্চ কুমারগাঁও এলাকায় এক ব্যবসায়ীর দুই লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় কেউই আইনের আওতায় আসেনি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ নানা অপরাধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে হানিট্র্যাপের ঘটনা বেড়েছে। হানিট্র্যাপের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত টাকা না পেয়ে খুনের ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের একটি ঘটনায় টাকার জন্য বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ১৮ জুন আম্বরখানা এলাকায় ৫তলা ভবন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
ছিনতাইসহ নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। ছিনতাইয়ের যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে সেগুলোর তদন্ত চলছে। আসামি শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
(যুগান্তর)