বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০০ অপরাহ্ন




গ্রামে ৪০-৪৫% লোডশেডিংয়ে জনরোষের শঙ্কা, পুলিশকে চিঠি

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬ ৫:২৪ pm
সাবস্টেশন লোডশেডিং বিদ্যুৎ loadshedding energy crisis electricity power grid বিদ্যুত বিভ্রাট লোডশেডিং মেগাওয়াট বিদ্যুত power power
file pic

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের পল্লী এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কোথাও বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। এ বিষয়ে আজ বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বুধবার জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৪৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ভোর ৪টায় চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৫১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় লোডশেডিং বেড়ে ৩ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুৎ সেবা দেয়। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির আওতায়। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের বরাদ্দ অনুযায়ী গ্রাহকদের সরবরাহ করা হয়। গত কয়েক দিনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর গড় চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কোথাও কোথাও দৈনিক ৮, ১০ এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জনরোষ বাড়ছে। এরই মধ্যে কিছু বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসে নিরাপত্তা জোরদারে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

হামলা-ভাঙচুর, অবরুদ্ধ কর্মকর্তা
লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। গত ১০ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাবস্টেশনে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সেখানে আব্দুল লতিফ নামে এক লাইনম্যানকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে গত ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকেরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন।

একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও বেশি বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন।

বিভিন্ন জেলায় নিরাপত্তা চাওয়া
নেত্রকোণায় দিন-রাত মিলিয়ে কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জেও দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ অফিস ও স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) জেলা পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। চিঠিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি বিদ্যুৎ স্থাপনায় নিয়মিত পুলিশি টহলের অনুরোধ করা হয়েছে।

নীলফামারীর ডোমারেও জাতীয় গ্রিডে ঘাটতির কারণে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ চলছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ায় ডোমার জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে থানায় লিখিতভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। সেখানে সাদা পোশাকে পুলিশি নজরদারি ও রাতে টহল বাড়ানো হয়েছে।

গ্যাস কমায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ
পল্লী এলাকায় লোডশেডিং বাড়ার পেছনে জ্বালানি সংকট বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

গত কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তির পর আবার কমেছে এলএনজি সরবরাহ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় মহেশখালীতে সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ এখন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট।

এদিকে, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু থাকলেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে সাময়িক বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনালটির সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, পূর্ণ সক্ষমতায় টার্মিনালটি চালাতে একটি বয়লার সচল করতে হবে। এ জন্য প্রায় ৭২ ঘণ্টা টার্মিনালটির উৎপাদন বন্ধ থাকতে পারে। কোন সময়ে বন্ধ রাখলে বিদ্যুৎ, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে প্রভাব কম হবে, তা নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব মিলিয়ে ১২ ঘণ্টারও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে কয়েক দিন ধরে রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পর অল্প সময়ের জন্য সরবরাহ আসছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে রাতে ঘুমাতে পারছেন না অনেকে।

সিলেট নগরেও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

সংকট কাটাতে নতুন উদ্যোগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, তৃতীয় ও চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীও আগ্রহ দেখিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটের একক কোনো সমাধান নেই। গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে যুক্ত করে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD