চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সময় বিমানের সিট-টয়লেট, লাগেজ, চার্জার, ব্যবহারের জিনিসপত্র, জুতাসহ যাত্রীর আন্ডারওয়্যার ও পেটেও মিলছে স্বর্ণ। যাত্রীদের পাশাপাশি চক্রের সদস্য হিসাবে কাজ করছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেবল তাই নয়, বিমানবন্দরে দায়িত্বরত চিকিৎসকের কাছ থেকেও উদ্ধার হয়েছে স্বর্ণের বার। খোদ বিমানবন্দরে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীদের কেউ কেউ জড়িত বলে অভিযোগ আছে। চোরাচালানে জড়িত একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র।
অভিযোগ, বাংলাদেশ বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কেবিন ক্রু এবং বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মেকানিক, কাস্টমস, সিভিল এভিয়েশন ও ইমিগ্রেশন পুলিশের কিছু সদস্যের সহায়তায় চোরাকারবারিরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই রুটে অবৈধভাবে স্বর্ণ আনছে। কখনো কখনো দু-একটি চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩ নম্বর গেটের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে বসে কথা বলছেন এক নিরাপত্তা প্রহরী। তার নাম নিজাম। অথচ এই গেটে তার দায়িত্বই ছিল না। ঠিক তখনই ইমিগ্রেশন পার হয়ে আসেন দুবাই থেকে আসা (এফজেড-৫৬৩) ফ্লাইটের যাত্রী মো. ওয়াহিদুল আলম। কাস্টমস বেল্টের সামনে প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে বারবার ফোনে কথা বলার পর ওই যাত্রী ইশারায় ডেকে নেন নিজামকে। ফুটেজে ধরা পড়ে কাগজে মোড়ানো একটি প্যাকেট নিজামের হাতে তুলে দিচ্ছেন ওই যাত্রী। প্যাকেট বুঝে নিয়ে ১০টা ৬ মিনিটে ৩ নম্বর গেট দিয়ে বের হয়ে যান তিনি। বিমানবন্দরের এপিআই অফিসের সামনে এক ব্যক্তির হাতে তা হস্তান্তর করে মাত্র এক মিনিটের মাথায় আবারও কাস্টমস হলে ফিরে আসেন। পরে ওই ব্যক্তি বিমানবন্দরের সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের কাছে বারগুলো পৌঁছে দেন বলে জানা যায়। এরই মধ্যে কাস্টমস হলে দায়িত্বরত গোয়েন্দা দল ওয়াহিদুলকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি শুরু করলে তার পকেট ও কোমর থেকে টেপ মোড়ানো তিনটি প্যাকেট বের করা হয়। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ২২০ গ্রাম স্বর্ণ জব্দ করা হয় এবং ১০০ গ্রাম স্বর্ণ ব্যাগেজ সুবিধার নিয়ম অনুযায়ী ওয়াহিদুলকে ফেরত দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়াহিদুল আলম দীর্ঘদিন ধরে ম্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। ১৯ জুলাই তিনি দুটি পৃথক চক্রের স্বর্ণ নিয়ে দেশে এসেছিলেন। সেদিন নিরাপত্তাকর্মী নিজামের সহায়তায় এক চক্রের স্বর্ণ বাইরে পাচার হলেও কাস্টমসে ধরা পড়ে রাঙ্গুনিয়ার জসিম সিন্ডিকেটের চালান। ঘটনার দিন সকাল ১০টা ৩৩ মিনিটে ওয়াহিদুলকে একটি কক্ষে নিয়ে তার শরীর তল্লাশি করা হয়। ওই সময় তল্লাশির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা চারটি স্বর্ণের বার গায়েব করে ফেলে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১০টা ৪১ মিনিটে সেই রুম থেকে বেরিয়ে দ্রুত অ্যারাইভাল হলের শেষ অংশের দিকে হেঁটে যান দুই কর্মকর্তা। পরে ১০টা ৪৩ মিনিটে তাদের একজন ফিরে এলেও অন্যজন মোবাইল ফোনে কথা বলতে থাকেন। এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নে ওয়াহিদুলের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ঘটনার এক সপ্তাহ পরই ওয়াহিদুল আবার দুবাই ফিরে যান বলে তার স্ত্রী জানিয়েছেন। অন্যদিকে ঘটনার দিনই (১৯ জুলাই) সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও প্রহরী নিজামকে বিমানবন্দর টার্মিনালের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বর্তমানে এই দুজন বিমানবন্দর আবাসিক এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বর্ণ হস্তান্তরের বিষয়টি অস্বীকার করে নিরাপত্তা প্রহরী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী। বলেন, ‘দুবাই থেকে আসা ওয়াহিদুল আলমের কাছে আমার এক বন্ধু একটি ফোন সেট দিয়েছিলেন। সেটি বুঝে নিয়ে এপিআই অফিসের সামনে আমার পরিচিত একজনকে দিয়েছি। তবে সেখানে যাওয়া আমার ঠিক হয়নি।
পতেঙ্গা থানা সূত্র জানায়, ২০২৪ সাল থেকে গত আড়াই বছরে থানায় স্বর্ণ চোরাচালান আইনে ৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে একটি, ২০২৫ সালে চারটি এবং চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে। সাত মামলায় ৯ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
(যুগান্তর)