দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পেমেন্ট গেটওয়ে ‘কিউক্যাশ’ এর সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে একযোগে ৩০টি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও অনলাইন লেনদেন সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে টানা প্রায় ছয় দিনের জন্য এই সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখ লাখ গ্রাহক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রাহকদের স্বার্থ ও আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তলব করা হয়েছে। খুব শিগগির স্যুইচিংসহ কার্ড সংশ্লিষ্ট সকল সেবা পুনরায় চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স এন্ড পাবলিকেশন্স বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি পরিচালিত কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও এনপিএসবি সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লেনদেন সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এনপিএসবি প্লাটফর্মের সাথে সরাসরি সংযুক্ত বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডার এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক লেনদেন অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত অন্যান্য প্লাটফর্ম যেমন—বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউস, বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক ও রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টসহসহ দেশের সকল পরিশোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ সময়ে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিকল্প পেমেন্ট প্লাটফর্ম ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।
কিউক্যাশের সেবা গ্রহণকারী ব্যাংকগুলো হলো– অগ্রণী, বাংলাদেশ কমার্স, কৃষি, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক, আলফালাহ, কমিউনিটি, আইসিবি ইসলামিক, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইএফআইসি, যমুনা, জনতা, মেঘনা, মার্কেন্টাইল, মিডল্যান্ড, মধুমতি, ন্যাশনাল, এনসিসি, এনআরবি কমার্শিয়াল, এনআরবি গ্লোবাল, রূপালী, শাহ্জালাল ইসলামী, সীমান্ত, এসআইবিএল, সোনালী, সাউথ বাংলা, ট্রাস্ট, ইউনিয়ন, উত্তরা এবং উরি ব্যাংক।
কিউক্যাশের মূল কোম্পানি আইটি কনসালট্যান্সের (আইটিসি) ওয়েবসাইটে যে নোটিশ প্রচার করা হয়েছে, তাতে সিস্টেম মাইগ্রেশনকে কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে নোটিশে প্রদত্ত নম্বরে যোগাযোগ করা হলে নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান– ‘এটা সিস্টেম আপগ্রেডেশন’। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংককে না জানিয়ে এবং গ্রাহকদের কোনো ধরনের আগাম নোটিশ না দিয়ে এভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন ব্যাংকের গ্রাহকরা।
কিছু ব্যাংকের গ্রাহকের দাবি, সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা পরও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহকদের এ বিষয়ে নোটিশ করেনি। ব্যাংকগুলো বলছে, কিউক্যাশের পক্ষ থেকে আগাম ঘোষণা না পাওয়ায় তারা গ্রাহকদের জানাতে পারেননি।
আইটিসির নোটিশ অনুযায়ী, গত রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ নির্ধারিত রয়েছে। এই সময়সীমায় কিউক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড, প্রিপেইড কার্ড, এটিএম বুথ, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) টার্মিনাল এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ফান্ড ট্রান্সফার (আইবিএফটি) সেবা ব্যাহত হবে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, যে কোনো কারণেই হোক, এটা যে প্রযুক্তিগত সমস্যা, তা পরিষ্কার। ফলে তাৎক্ষণিক সমাধান নেই, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে– এ ধরনের কোনো মেনটেইনেন্স করার অনেক আগে থেকেই পত্রিকা, টিভি এবং গ্রাহকদের মেসেজ পাঠিয়ে আগাম বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। কারণ গ্রাহকদের এভাবে বিড়ম্বনায় ফেলার অধিকার কোনো ব্যাংকের নেই।
তিনি আরও জানান, কিউক্যাশ বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এই সিস্টেম মাইগ্রেশনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে কিছুই জানায়নি। গ্রাহকদেরও আগাম কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। বিষয়টিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে খুব শিগগির সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চাইবে, কেন তারা গ্রাহকদের আগে না জানিয়ে এককভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং সেবা বন্ধ রাখল।
তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালট্যান্টসের (আইটিসি) পেমেন্ট গেটওয়ে কিউক্যাশ হলো ব্যাংকগুলোর কার্ডভিত্তিক লেনদেনের একটি যৌথ পেমেন্ট সুইচ ও এটিএম/পিওএস নেটওয়ার্ক।
আইটিসির হেড অব প্লানিং ফাইজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমাদের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ২৮ অক্টোবর থেকে সেবা বন্ধ করার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ তারিখে এগিয়ে আনা হয়েছে। আগে থেকে কেন নোটিশ করা হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি।