বিশ্ব দরবারে দেশের রপ্তানি পণ্য আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে এ বছর থেকে আয়োজন করা হবে ঢাকা আন্তর্জাতিক রপ্তানি মেলা। এর মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট শিল্প-কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার ও কারখানার কর্মপরিবেশ তুলে ধরা সহজ হবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। এতে ক্রেতা ও বড় বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান এক ছাদের নিছে সবাইকে পাবে এবং শিল্প সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করবে। বাড়বে বিনিয়োগ ও ক্রয় আদেশ।
মূলত ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় রপ্তানিমুখী শিল্প উদ্যোক্তাদের আগ্রহ না থাকায় বিকল্প এই আয়োজন করবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সময় নির্ধারণ করা হবে। পূর্বাচলের যেখানে এখন বাণিজ্য মেলা হচ্ছে, সেখানে বছরের যে কোনো সময় এই আয়োজন হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি বছরের অন্যান্য সময় আয়োজিত মেলাগুলোও পূর্বাচলের এই ঠিকানায় নেওয়া হবে বলেও তারা জানান।
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, এখন যে বাণিজ্য মেলা হচ্ছে, সেখানে আমরা গেলে ক্রেতারা আসবেন না। এটি আমাদের জন্য না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে রপ্তানি, বিদেশের ক্রেতা।
তবে বাণিজ্য মেলায় অন্যান্য খাতের উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য তুলে ধরতে পারছেন। এটি ভালো দিক উল্লেখ করে ফারুক হাসান বলেন, সেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়। উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য সম্পর্কে ক্রেতার ধারণা পেয়ে থাকেন। আমরাও চাই ক্রেতাদের কাছে আমাদের পণ্য তুলে ধরতে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার অভাবে বাণিজ্য মেলার সঙ্গে আমরা যেতে পারি না। আসলে বাণিজ্য মেলা বলতে আমদানি-রপ্তানির যে বিষয় বোঝায়, ওখানে ঠিক সে রকম না। এটা মূলত দেশীয় পণ্যের মিলনমেলা।
তবে এই উদ্যোগ চালু রেখে তৈরি পোশাক শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়ে আলাদা আয়োজনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সরকার সব সময় আমাদের সহায়তা করে আসছে। আমরাও সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। ক্রেতা আকৃষ্ট করতে নানা আয়োজন করছি। এজন্য বলছি, এখন যে জায়গায় বাণিজ্য মেলা হচ্ছে, সেখানে যাতায়াত সুবিধা ভালো। সেখানে আমরা আলাদা রপ্তানি মেলা, বিশেষ করে ১০০ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের সবাইকে নিয়ে এক ছাদের নিচে বসার উদ্যোগ নিলে অনেক ভালো হবে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সবাইকে পাবে, ক্রয় আদেশ বাড়বে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়বে। এক কথায় দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে।
১৯৯৫ সাল থেকে নিয়মিত ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার হলেও অংশগ্রহণ করেননি দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এটা তো বাণিজ্য মেলা, এটা রপ্তানি মেলা নয়। যেখানে বাণিজ্য হবে সেখানে কেনাবেচা হবে, এটা স্বাভাবিক। আর যেখানে প্রদর্শনী বা রপ্তানিভিত্তিক মেলা হবে, সেখানে শুধু ক্রেতা এবং উদ্যোক্তা থাকবে, চুক্তি হবে। কিন্তু ক্যাশ লেনদেন তেমন একটা হবে না। এক কথায় খুচরা বিক্রি হবে না। কিন্তু আমাদেরটা বাণিজ্য মেলা। এটা মনে রাখতে হবে, বিদেশের পাশাপাশি দেশেও একটা বড় বাজার রয়েছে, যেজন্য স্থানীয় ক্রেতাকে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে নিজেদের বাজার সুরক্ষারও একটা ব্যাপার থাকে। আর বাণিজ্য হওয়ার কারণে যে যার পণ্য নিয়ে উপস্থিতি হয়েছেন। সব ধরনের ক্রেতা আসছেন এবং কিনছেন।
তবে ১০০ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাণিজ্য মেলা যেখানে হচ্ছে, তা ইপিবির নিজস্ব এবং স্থায়ী স্থাপনা। একে কাজে লাগাতে পারেন প্রধান রপ্তানি খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের প্রতি আহ্বান থাকবে, বিচ্ছিন্নভাবে যেখানে সেখানে মেলা বা প্রদর্শনী না করে স্থায়ী ঠিকানায় আসার জন্য। পাশাপাশি পূর্বাচলের ওই এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের মেলা আয়োজন করার ক্ষেত্রে এখনো কিছু সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে, সেগুলো পূরণ হলে আমাদের দেশেও বিশ্বমানের রপ্তানি মেলা হবে।
আন্তর্জাতিক রপ্তানি মেলার প্রসঙ্গে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিদেশি ক্রেতা বা অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ কম, এটা সঠিক। আগে আয়োজনে অনেক ঘাটতি ছিল। এখন স্থায়ী ঠিকানায় এসেছি। বছরের অন্য সময়ে সোর্সিং ফেয়ার করব। এ বছর থেকে রপ্তানি মেলা করব। পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের প্রতি আহ্বান থাকবে, বছরের বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে মেলার আয়োজন না করে পূর্বাচলের নির্ধারিত স্থানে আয়োজন করার জন্য।
মূলত প্রচলিত ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় প্রতিবছর ফার্নিচার, প্লাস্টিক, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস, গৃহসমাগ্রী, খাদ্যপণ্য, এসএমই, পাটজাত পণ্য, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করে আসছেন। এতে দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ পছন্দের পণ্য কিনছেন। অন্যদিকে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল, তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি না হওয়া ও দাম বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ কম থাকে। এক্ষেত্রে শুধু খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগে আগ্রহী এবং বিদেশিরা অংশগ্রহণ করেন বেশি। যেজন্য প্রয়োজন হয় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও বিশেষ যাতায়াত সুযোগ-সুবিধার। আর এই বিবেচনায় সরকার পূর্বাচলের ৪ নম্বর সেক্টরে ২০ একর জমির ওপর বিবিসিএফইসি গড়ে তোলে। ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে চীনের চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। ২০২০ সালের নভেম্বরে নির্মাণ কাজ শেষে ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মালিক প্রতিষ্ঠান ইপিবির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমানে সেখানে বাণিজ্য মেলার ২৭তম এবং স্থায়ী ঠিকানার দ্বিতীয় আসর চলছে।