সাইবার ডাকাতদের সরবরাহকৃত ভুয়া লিংকে ক্লিক করলেই আপডেটের ফাঁদে কয়েক মিনিটের মধ্যে মুঠোফোনে থাকা ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপস থেকে উধাও হচ্ছে টাকা। আবার অনেক সময় হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামভিত্তিক ভুয়া চাকরি, অনলাইন টাস্ক, মুভি রেটিং ও ইনভেস্টমেন্টের প্রলোভনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রথমে ছোট অঙ্কের টাকা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন, পরে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে পুরো সঞ্চয় শূন্য করে দিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এসব টাকা মুহূর্তের মধ্যে শত শত বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে নানান কৌশলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এগুলো ক্যাশ-আউট ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হচ্ছে হাজার হাজার ভুয়া বা ভাড়া করা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, যেগুলোর প্রায় সবগুলোই অন্যের এনআইডি ও অন্যের নামে নিবন্ধিত সিমের সমন্বয়ে তৈরি। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। যেগুলো নানা প্রলোভন দেখিয়ে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের খোলা হয়ে থাকে। সবমিলিয়ে প্রতারণা ও অপরাধ জগতের লেনদেন ও মূলহোতাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাইবার প্রতারণার এসব ঘটনা তদন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বেশিরভাগ থানায় মামলা হয় না। এ কারণে উল্লেখযোগ্য ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিকার পান না। এসব ঘটনায় কেউ কেউ আদালতে মামলা করে থাকেন। বিচারক এগুলো পুলিশের বিশেষায়িত কোনো সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে থাকেন। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনায় শত শত মামলা হচ্ছে চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এসব ঘটনা তদন্ত ও বিশ্লেষণে উঠে আসছে প্রতারণার সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে, কোন চ্যানেলে হাতবদল হচ্ছে। শুধু প্রতারণার টাকা নয়, একই সঙ্গে ওঠে এসেছে ভয়ঙ্কর নানা অপরাধের লেনদেন কীভাবে ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার দুর্বলতাকে ব্যবহার করে দ্রুত উত্তোলন ও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই হাজার হাজার কোটি টাকা কীভাবে দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতারণার টাকা কখনোই দীর্ঘ সময় একটি অ্যাকাউন্টে রাখা হয় না। এসব টাকা সরানোর জন্য আগে থেকেই একটি নেটওয়ার্ক প্রস্তুত করে রাখে চক্রটি। এই নেটওয়ার্কে শত শত বিকাশ বা নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়। যাতে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব অ্যাকাউন্টের বড় অংশই অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি ব্যবহার করে খোলা। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ, দিনমজুর, বৃদ্ধ ব্যক্তি, রিকশাচালক বা অশিক্ষিত মানুষের এনআইডি সংগ্রহ করে তাদের অজান্তেই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। আবার কখনো টাকার বিনিময়ে দরিদ্র মানুষের সিম ও এনআইডি ভাড়া নেওয়া হয়।
গত ৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার এক ব্যবসায়ীর মোবাইলে এমনই একটি রহস্যজনক নোটিফিকেশন আসে। এটি ক্লিক করতেই ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হতে শুরু করে। আপডেট শেষ হওয়ার পর তিনি লক্ষ্য করেন, ফোনের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরে জানতে পারেন, তার জি-মেইল ও গুগল পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে সংরক্ষিত ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও পিন কোডসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ডেটা প্রতারকরা হাতিয়ে নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতারক চক্র লোহাগাড়া ও কেরানীহাট এলাকার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) দুটি শাখায় থাকা তার হিসাব থেকে ধাপে ধাপে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৪৫০ টাকা তুলে নেয়। মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একাধিক অপরিচিত হিসাবে এই টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।
পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করছেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহেদুল ইসলাম। আইটি বিষয়ে দক্ষ এই কর্মকর্তা ঘটনাটি তদন্তে নেমে পড়েছেন জটিলতায়। প্রতারণাটা টাকাগুলো সরাতে ব্যবহৃত হয়েছে অন্তত অর্ধশতাধিক বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট। সবগুলোই একজনের নামে সিম নিবন্ধিত এবং আরেকজনের নামে বিকাশ অ্যাকাউন্ট। তবে সব স্তর পেরিয়ে মূল হোতাদের বের করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে মাঈন উদ্দিন নামে একজন ভুক্তভোগীর দায়ের হওয়া একটি সাইবার প্রতারণা মামলার তদন্ত করেছেন নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, imdbmovie-click.com নামে ভুয়া একটি ওয়েবসাইট খুলে টেলিগ্রামের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে অনলাইনে পার্টটাইম চাকরি ও মুভি রেটিংয়ের কাজের প্রলোভন দেখানো হয়। প্রথমে কয়েক হাজার টাকা জমা নিয়ে কমিশনসহ ফেরত দেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীরা সহজেই আস্থা পেয়ে যান। পরে ভিআইপি অ্যাকাউন্ট, টাস্ক আনলক ও সিস্টেম অ্যাক্টিভেশনের কথা বলে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। এমন করে ভুক্তভোগীর কাছ থেকেই ৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৩২ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। প্রতারণার এই টাকা সরাতে ব্যবহার করা হয় একাধিক বিকাশ অ্যাকাউন্ট। যেগুলোর বেশিরভাগই যে নামে সিম নিবন্ধিত তার নয়।
মামলার তদন্তে দেখা যায়, একটি বিকাশ নম্বর ০১৯…০৩ রাজিয়া বেগম (৩১) নামে নিবন্ধিত। অ্যাকাউন্টটির কেওয়াইসিতে ব্যবহার করা হয়েছে এনআইডি নম্বর ৮২…৫৩। এই নম্বরে দুই দফায় ১২ হাজার টাকা পাঠানো হয়। কিন্তু তদন্তে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে প্রথমে ওই নারীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিকাশ নম্বর ০১…৮৯ রহিমা খাতুন (৬৮) নামে নিবন্ধিত। এই নম্বরে ৬ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তারা তার ঠিকানায় গিয়ে এমন কাউকে খুঁজে পাননি। পুলিশ বলছে, নম্বরটি ব্যবহার করে প্রতারণার অর্থ গ্রহণ করা হলেও নিবন্ধিত ব্যক্তির অস্তিত্ব না পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কেউ ওই সিম ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে। বিকাশ নম্বর ০১…৮৭ মনোয়া বেগম (৪৩) নামে নিবন্ধিত। এই নম্বরে দুই ধাপে ৩৬ হাজার ৪ টাকা পাঠানো হয়। তদন্তে এই অ্যাকাউন্টেও প্রকৃত ব্যবহারকারী ও নিবন্ধিত তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি উঠে আসে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন সাইবার প্রতারকরা আর নিজেদের নামে সিম বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে না। গ্রামের সাধারণ মানুষ, বৃদ্ধ নারী কিংবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তিদের এনআইডি ব্যবহার করে সিম ও বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে। পরে সেগুলো ভাড়া বা কমিশনের ভিত্তিতে ব্যবহার করছে অপরাধচক্র। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত এনআইডি মালিক জানেনই না যে তার পরিচয়ে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।
কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক সঞ্জয় কুমার সিনহা বলেন, “মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ দিলে, তাহলে অপরাধীদের সহজেই আইনের আওতায় আনা যায়। সিম নিবন্ধন ও মোবাইল ব্যাংকিং কেওয়াইসি যাচাই প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা থাকায় প্রতারকরা সহজেই এই সুযোগ নিচ্ছে। বিশেষ করে এজেন্ট পর্যায়ে যথাযথ যাচাই না হওয়া এবং সিম বিক্রির সময় প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্ত না করার কারণে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। আর ব্যাংকগুলো তাদের অ্যাপস যাতে যার নামে অ্যাকাউন্ট, তিনিই শুধু ব্যবহার করতে পারেন। এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করাটা উচিৎ।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মামলা তদন্তের সঙ্গে জড়িত কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ-পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা একজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানান, ভুক্তভোগী মোবাইলের টেলিগ্রাম গ্রুপে আসা ভুয়া লিংকে প্রবেশ করেন। এসব লিংকে প্রবেশের পর তাকে প্রথমে সেখানে ১ হাজার টাকা জমা হয়েছে দেখানো হয়। ওই টাকা উত্তোলন করতে গেলে ব্যবহারকারীকে আরও ১ হাজার বা ২ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে বলা হয়। পরবর্তীতে ওই ১ হাজার বা ২ হাজার টাকা বিনিয়োগ করলে আবার ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ দেখানো হয়, যা মূলত এক ধরনের কৃত্রিম লভ্যাংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর ভুক্তভোগীরা লোভে পড়ে একাধিকবার ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৫০ হাজার এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেন। এক পর্যায়ে এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট ওয়েব ব্রাউজার বা অনলাইন লিংকে আটকে দেওয়া হয়। পরে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করলে প্রতারকেরা জানায়, আরও ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে পূর্বের টাকা উত্তোলন করা যাবে। এই প্রলোভনে পড়ে ভুক্তভোগীরা আবারও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন, কিন্তু পরবর্তীতেও তাদের টাকা আটকে দেওয়া হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ, ১০ লাখ, ৩০ লাখ এবং সর্বোচ্চ ৫৭ লাখ ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা পাওয়া গেছে, এবং পরবর্তীতে এসব অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, কোন প্রক্রিয়ায় এসব টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সাইবার ইউনিটের এক কর্মকর্তার দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, বিদেশি কিছু নাগরিক, বিশেষ করে চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ঢাকার উত্তরা, দিয়াবাড়ীসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অবস্থান করে এবং সেখানে অফিসের মতো পরিবেশ তৈরি করে। এরপর তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় লোকজনকে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং তাদের মাসিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেয়। এসব প্রতিনিধির মাধ্যমে গরিব দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, রিকশাচালক, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
অ্যাকাউন্ট খোলার পরপরই তাদের ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা নগদ দেওয়া হয় এবং আশ্বাস দেওয়া হয় যে আগামী মাসে সরকারি প্রণোদনার টাকা মোবাইলে চলে আসবে। এরপর এসব একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রতারণার অর্থ এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। একই সঙ্গে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি করে এসব অর্থ এসআরদের মাধ্যমে লেনদেন করানো হয়, যাতে অর্থের উৎস গোপন রাখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে প্রবাসীদের সঙ্গেও চুক্তি করা হয়, যেখানে তাদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশে সমপরিমাণ টাকা দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে প্রবাসীদের কাছ থেকে ডলার বা রুপি গ্রহণ করা হয়। এভাবে দেশীয় অর্থকে বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে সহজেই বিদেশে পাচার করা হয় বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি এমএফএস অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সিমের মালিক এবং অ্যাকাউন্টধারীর এনআইডি একই ব্যক্তির হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডিজিটাল কেওয়াইসি প্রক্রিয়ায় গ্রাহকের তথ্য নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজের সঙ্গে যাচাইও করা হয়। কিন্তু বাস্তবে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, শিথিল যাচাই ব্যবস্থা এবং কিছু অসাধু এজেন্টের সহযোগিতায় একজনের সিমে অন্যজনের এনআইডি ব্যবহার করে বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু এজেন্ট অতিরিক্ত কমিশনের লোভে নিজেরাই ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলায় সহযোগিতা করেন। তারা অনেক সময় গ্রাহকের উপস্থিতি ছাড়াই ছবি তুলে, পুরোনো ছবি ব্যবহার করে অথবা দুর্বল মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করে দেন। তদন্তকারীরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের কিছু ডিস্ট্রিবিউটর সেলস অফিসার বা ডিএসও এবং ডিস্ট্রিবিউটরও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তারা বিপুল পরিমাণ ই-মানি দ্রুত বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে নগদ টাকায় রূপান্তরে সহায়তা করেন।
সাইবার অপরাধীরা ভুক্তভোগীর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর সেটি সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ভাগ করে দেয়। মানি লন্ডারিংয়ের ভাষায় এই পদ্ধতিকে লেয়ারিং বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে তদন্তকারীরা বলছেন, কোনো ভুক্তভোগীর অ্যাকাউন্ট থেকে এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি ১০ থেকে ১৫টি আলাদা বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টে ভাগ হয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে আবার অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। ফলে তদন্তে একটি অ্যাকাউন্ট ট্র্যাক করতে করতে মূল অর্থের গতিপথ জটিল হয়ে পড়ে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে ক্যাশ-আউট
টাকা হস্তান্তরের পর শুরু হয় ক্যাশ-আউট বা টাকা উত্তোলনের ধাপ। অপরাধীরা সাধারণত নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে টাকা তোলে এবং এমন এজেন্ট পয়েন্ট বেছে নেয়, যেখানে সিসি ক্যামেরা নেই বা জনসমাগম বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাতের বেলায় অ্যাপের বাইরে গিয়ে নগদ লেনদেন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু এজেন্ট অতিরিক্ত কমিশনের বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনে সহযোগিতা করেন। আবার অনেক এজেন্ট না বুঝেই প্রতারকদের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন। কারণ প্রতারকেরা সাধারণ গ্রাহক সেজে টাকা উত্তোলন করে এবং সন্দেহ এড়াতে ছোট ছোট ভাগে ক্যাশ-আউট করে।
টাকার লোভে পড়ে মামলার আসামি হচ্ছেন এজেন্টরা
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে পুলিশ, সিআইডি বা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা প্রথমে লেনদেনের ডিজিটাল স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করে। এতে খুব সহজেই শনাক্ত করা যায় কোন এজেন্ট পয়েন্ট থেকে প্রতারণার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এরপর মূল অপরাধী ধরা না পড়লেও সংশ্লিষ্ট এজেন্টকে মামলার আসামি হতে হয়। দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অনেক এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। এর ফলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট জব্দ হচ্ছে, ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল হচ্ছে এবং অনেককে গ্রেপ্তারও হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজমে একটি নালিশি মামলার সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে সাব্যস্ত এক বিকাশ-নগদ এজেন্টের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। নোয়াখালী জেলায় বাড়ি ওই ব্যক্তি বলেন, “এক লাখ টাকা লেনদেনে ৪০০ টাকার মতো কমিশন পাওয়া যায়। কিন্তু এক প্রতারকের ফাঁদে পড়ে লাখে ৩ হাজার কমিশনের চুক্তিতে নিয়ম না মেনে লেনদেন করেছি। পরে জানতে পেরেছি এগুলো প্রতারণার টাকা। এখন পুলিশ আমার বাড়িতে অনুসন্ধানী স্লিপ পাঠিয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করতে ডেকেছে। সামান্য লোভে পড়ে আমি নিজের অজান্তেই একটা মামলার আসামি হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছি।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, “মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোর নিয়মানুযায়ী মাঠপর্যায়ের এজেন্টদের আয়ের বড় অংশ আসে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা এবং লেনদেনের কমিশন থেকে। ফলে সিম ও এনআইডির মালিক একই ব্যক্তি কি না, তা যাচাই করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট খুলে কমিশন নেওয়ার দিকেই তাদের মনোযোগ বেশি থাকে। আবার শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের কার্যক্রম বড় পরিসরে দেখানোর জন্য অনেক সময় কোম্পানিগুলো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া অতিরিক্ত সহজ বা শিথিল করে দেয়। এতে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।”
ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিদেশে পাচার
প্রতারণার টাকা শুধু দেশে উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর একটি বড় অংশ বিদেশেও পাচার হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্ক। তদন্তে উঠে এসেছে, বিদেশে অবস্থানরত হুন্ডি চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশের সাইবার অপরাধীদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে কাজ করে। বিদেশে থাকা কেউ হুন্ডি এজেন্টের কাছে ডলার বা রিয়াল জমা দিলে বাংলাদেশে থাকা প্রতারক চক্র প্রতারণা করে হাতিয়ে নেওয়া টাকা থেকে সমপরিমাণ অর্থ ওই ব্যক্তির পরিবারের বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। ফলে বৈধ রেমিট্যান্স দেশে না এসে বিদেশেই থেকে যায় এবং একই সঙ্গে প্রতারণার টাকাও পাচার হয়ে যায়।
এছাড়া বিকাশ বা নগদের টাকা ব্যবহার করে পিয়ার-টু-পিয়ার প্ল্যাটফর্মে ইউএসডিটি বা বিটকয়েন কেনার প্রবণতাও বাড়ছে। পরে সেই ক্রিপ্টোকারেন্সি বিদেশি ওয়ালেটে স্থানান্তর করে ডলারে রূপান্তর করা হয়। এই পদ্ধতিতে টাকা পাচার হলে তার উৎস শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক রুনা সাহা এ ব্যাপারে বলেন, “ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে বিদেশ থেকে অবৈধভাবে হুন্ডির টাকা দেশে আনা হয়। পাচারকারী চক্র প্রবাসীদের কাছ থেকে ডলার রেখে দেশে তাদের স্বজনদের মোবাইল ব্যাংকিং বা হুন্ডির মাধ্যমে সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ করে। এমএফএস এজেন্ট অ্যাপ বা কাস্টমাইজড সফটওয়্যার ব্যবহার করে এক ক্লিকেই শত শত নম্বরে টাকা পাঠানো হয়। আপাতদৃষ্টিতে এগুলো সাধারণ লেনদেন মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি সুসংগঠিত ডিজিটাল হুন্ডি চক্র। দেশ থেকে টাকা প্রথমে ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে ডলারে রূপান্তর করা হয়। পরে সেই ডলার দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিশেষ করে স্টেবলকয়েন যেমন ইউএসডিটি কেনা হয়, যার মূল্য সাধারণত ১ ডলারের সমান থাকে। এই ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পাচার করা সম্ভব এবং পরে তা স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করে তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার দেশের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে না। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, যা বর্তমান অর্থনীতিতে ডলার সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।”
তিনি আরও বলেন, “ডলারের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর প্রায় সব পণ্যের খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। অর্থনীতির ভাষায় একে ব্যয়-বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি বলা হয়। অন্যদিকে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বা জমা টাকার পরিমাণ কমে গিয়ে তৈরি হয় তারল্য সংকট। ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তারা ভালো ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় ঋণ দিতে পারে না। ফলে নতুন ব্যবসা শুরু করা কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি একদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করছে, অন্যদিকে অর্থ পাচারের মাধ্যমে একটি শ্রেণি বিদেশে বিলাসী জীবনযাপন করছে। আর এর সামগ্রিক খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষকে।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, “যেসব অ্যাকাউন্টের লেনদেন সন্দেহজনক মনে হয়, আমরা তার প্রতিবেদন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) সরবরাহ করি। অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, অর্থ পাচার, জঙ্গি অর্থায়ন, অননুমোদিত অ্যাপ সহ সংশ্লিষ্ট সব অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিকাশের যথাযথ প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী নিয়োজিত আছে।”
তিনি বলেন, “পাশাপাশি অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো তদন্তে প্রয়োজনীয় সব সহায়তাও দিয়ে থাকি। এমন সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থাও নিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “অ্যাপস হ্যাকের এগুলো এখনো আমাদের একেবারে নখদর্পনে নেই। তবে আমরা অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসরণ করতে নিয়মিত বলা হয়। আমরা তাদের সঙ্গে মিটিং করি এবং সেখানেও নির্দেশনা দিই। নীতিমালা অবশ্যই মানতে হবে।”
বিভিন্ন প্রতারণা বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার টাকা বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে পাচার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে কোনো কথা বলব না। তবে এটা আমাদের দেশে নিষিদ্ধ। সিআইডি ও বিএফআইইউ এই ইস্যুগুলো দেখছে। ফলে আমাদেরকে আলাদা করে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন পড়ছে না।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়সারা তদারকি করলে চলবে না। দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি যেসব অনিয়ম সামনে আসবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ব্যাংকের দায়িত্ব শুধু আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জনগণকে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সম্পর্কে সচেতন ও শিক্ষিত করাও ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু ওয়ার্কশপ, সেমিনার, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম কিংবা কৃষক-শ্রমিকদের আর্থিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোর ভূমিকা খুবই অপ্রতুল।” ঢাকাপোস্ট