টিকিটিং ব্যবস্থা উন্নয়ন ও টিকিট কালোবাজারি রোধে ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী ১ মার্চ কার্যক্রমটি শুরু করবে রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ। তবে টিকিটিং ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দেয়ায় এ পদ্ধতি চালু করতে সপ্তাহেরও কম সময় পাচ্ছে রেলওয়ে। ফলে বিভাগীয় স্টেশনগুলোতে জাতীয় পরিচিতি নম্বর (এনআইডি) যুক্ত করে নিবন্ধনে উদ্বুদ্ধকরণ ছাড়াও দেশব্যাপী সীমিতসংখ্যক ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) ও টিকিট সংগ্রাহককে (টিসি) প্রশিক্ষণ দিচ্ছে রেলওয়ে। উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশকিছু অমীমাংসিত সিদ্ধান্ত ছাড়াই অনেকটা পাইলটিং আকারেই মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে রেলওয়ে।
‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ নীতি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে চায় রেলওয়ে। কিন্তু চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ টিটিই-টিসি, চলন্ত ট্রেনে অপর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, আর চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বুকিং সহকারী নিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে রেলওয়েকে।
রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন বা পজ মেশিনের মাধ্যমে টিকিটের মাধ্যমে অবৈধ বা টিকিটবিহীন যাত্রীর টিকিট কেটে দেয়া ছাড়াও প্রদর্শিত টিকিটে যাত্রীর নাম ও এনআইডির সঙ্গে সার্ভারের মিল আছে কিনা, তা পরীক্ষা করবেন রেলের পরীক্ষকরা। পরীক্ষামূলকভাবে আগামী ১ মার্চের আগে সারা দেশের সর্বোচ্চ দুই শতাধিক টিটিই, টিসিকে বিশেষ ট্রেনিং প্রদান করবে রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন (জেভি)। এরই মধ্যে রেলওয়ের চারটি বিভাগ যথাক্রমে চট্টগ্রাম, ঢাকা, পাকশী ও লালমনিরহাট থেকে টিটিই ও টিসিদের তালিকা পাঠিয়েছে নিজ নিজ বাণিজ্যিক বিভাগ।
পূর্বাঞ্চল রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টিটিই-টিসিদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ একটি তালিকা রেল ভবনে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৪৪ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম হেডকোয়ার্টার থেকে ১৫ জন টিটিই, লাকসাম থেকে ৮ জন টিটিই, চাঁদপুর থেকে দুজন টিটিই পজ মেশিন ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম হেডকোয়ার্টার থেকে ১৩ জন টিসি, লাকসাম ও কুমিল্লা থেকে দুজন করে এবং ষোলশহর ও ফেনী থেকে একজন করে টিসি পজ মেশিন ব্যবহারের বিশেষ এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘রেলওয়ের সেবা বৃদ্ধি, নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরও টিকিট কালোবাজারি একটি কলঙ্ক হিসেবে জারি আছে। সব ধরনের মানুষের রেলের টিকিট প্রাপ্তি নিশ্চিত করতেই “টিকিট যার ভ্রমণ তার’’ নীতি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। যেকোনো নতুন নিয়ম চালু বা বাস্তবায়ন করতে সময়ক্ষেপণ কিংবা বেগ পেতে হয়। শুরুতে কিছুটা অসুবিধা হলেও মানুষ রেলের নতুন এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে বলে মনে করি।’
বর্তমান নিয়মে একজন ব্যক্তি তার একই সময়ে সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। এক ব্যক্তি নিজ নামে ৪টি টিকিট সংগ্রহের পর পরিবারের অন্য সদস্যরা ওই টিকিটে ভ্রমণ করতে পারবে কিনা কিংবা পিতার সংগ্রহ করা টিকিট দিয়ে সন্তান ভ্রমণ করতে পারবে কিনা—এসব প্রশ্নের সদুত্তর না রেখেই কার্যক্রমটি আগামী ১ মার্চ চালু করতে চায় রেলওয়ে। শুরুতে রেলের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত রেল টিকিটের কালোবাজারি রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা।
রেলের অনলাইন টিকিট ক্রয়ের জন্য অ্যাপসের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা গ্রাহকরা শুধু এনআইডি নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে ভেরিফাই করে রেলওয়ের টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন। অন্যদিকে যাদের আগে রেজিস্ট্রেশন করা নেই তাদের রেলওয়ের ওয়েবসাইট কিংবা রেল সেবা অ্যাপে নাম-ঠিকানা ও এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।
শুরুতে টিকিট চেক করার সময় একাধিক বিষয়ে ছাড় দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, শুরুতে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে উদাসীন থাকবেন। এজন্য টিকিট চেক করার সময় সতর্ক করা হবে। পাশাপাশি আগের ইএফটি (এক্সট্রা ফেয়ার টিকিট) টিকিটের পরিবর্তে পজ মেশিনের মাধ্যমে ডিজিটাল টিকিটই দেয়া হবে চলন্ত ট্রেনে। এতে টিটিইদের বিরুদ্ধে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ কমে যাবে বলে আশা করছে রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ। পাশাপাশি অনলাইনে সংগ্রহ করা টিকিট অনলাইনে রিফান্ড করার সুযোগ রাখছে রেলওয়ে।
রেলের নতুন এ উদ্যোগে শুরুতে ১০০টি পজ মেশিনের মাধ্যমে চলন্ত ট্রেনে টিকিট যাচাই ছাড়াও অবৈধ ও টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হবে। যদিও এখন পর্যন্ত টিটিই-টিসিদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমই শুরু করতে পারেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। [বণিক বার্তা]