ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজ হওয়ার পরে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যেনো সরকারের বাকি সময়টুকুর মধ্যেই পুরো ব্যবস্থাপনা সহজ করে জনগণের ভোগান্তি কমানো যায়। তবে এখনও অনেক জটিলতা আছে। ভূমিসেবা পেতে এখনও মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারের অডিটোরিয়ামে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ভূমি ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক উদ্যোগ ও নাগরিক অধিকার’ শীর্ষক এক সংলাপে এ কথা বলেন তিনি। এসডিজি বাস্তবায়ন নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভূমি সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক মিজ শাহীন আনাম।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, আমরা জমিজমা নিয়ে কাজ করছি। উন্নত দেশে লোকজন জমিজমা সম্পর্কে খুব কম জানে। তাই তারা দায়-দায়িত্ব উকিলের ওপর ছেড়ে দেয়। তবে আমরা যা-ই কাজ করি, তা সামগ্রিকভাবে করি। আমি চাচ্ছি এলাকাভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং অথরিটি থাকবে। সেখানে গিয়ে এলাকার মানুষ সেবা নেবে। একটি ফিও নির্ধারণ করা থাকবে। আমরা সেখানে অভিযোগ নেবো। যারা ফি বেশি নেবে কিংবা হয়রানি করবে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। আমরা সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা চাই।
মন্ত্রী বলেন, ভূমি সম্পর্কিত যে সব সমস্যা রয়েছে, তার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব হবে না। তবে আমরা জনগণের ভোগান্তি দূর করার জন্য যতদূর সম্ভব সেটা করেছি। এবং টেকসই উন্নয়নকে সামনে রেখে করেছি। যাতে আগামীতে অন্য সরকার দায়িত্বে এলে তাদের নতুন করে শুরু করতে না হয়। ভূমি সম্পর্কিত সকল সমস্যার সমাধান পাবে। তিনি বলেন, ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কর্মকর্তাদের কাজকে জবাবদিহির অধীনে আনা হয়েছে, যাতে কোনো মানুষ সেবা নিতে এসে দিনের পর দিন না ঘোরেন, হয়রানির শিকার না হন এবং অর্থ ব্যয় না করতে হয়। এ জন্য সেবাপ্রার্থীকেও সচেতন হতে হবে। মানুষ শতভাগ সচেতন না, প্রযুক্তির ব্যবহারও সবাই করতে পারে না। আর ভূমি অফিসগুলোর কাছে তথ্য জানতে গেলে সহযোগিতা করে না-এমন অভিযোগ আছে। দেশে ইন্টারনেটের গতিও কম, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এ অবস্থায় সেবা পাওয়া সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে ভূমিমন্ত্রী বলেন, উন্নত বিশ্বের সব মানুষ জমি সম্পর্কিত কাজে অভিজ্ঞ না। মধ্যবর্তী একটি শ্রেণি আছে, যারা এ কাজগুলো করে থাকে। আমরাও চিন্তা করেছি এ সম্পর্কিত কাজের জন্য একটি পেশাজীবী গড়ে উঠবে, যারা কম্পিউটার-নেট নিয়ে কাজ করবে। তারা একটি মিনিমাম চার্জের বিনিময়ে সেবা দেবে। তবে গ্রাহকের কোনো সমস্যা করলে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভূমিসেবায় মন্ত্রণালয়ের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর যে উন্নয়ন হয়েছে তার সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায়। সেটাই নাগরিক সমাজ দেখতে চায়। তিনি বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল ম্যাপ ও তথ্যে প্রকৃত মালিক, জমির সীমানা নির্ধারণসহ যাবতীয় তথ্যের কথা বলা হয়েছে। এটা কতটা সফল তা নির্ভর করছে এ ব্যবস্থাপনা কতটা অংশগ্রহণমূলক হয়েছে এবং কতটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তার ওপর। তবে ভূমির ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে বড় উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভূমি সচিব মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পূরাতন জমি ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে মামলা হচ্ছে এবং যুগ যুগ ধরে চলছে। কিন্তু ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা-ম্যাপ ও খতিয়ান তৈরি হলে দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। জমির ডিজিটাল ম্যাপ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট জমির সীমানা, পরিমাণ, চৌহদ্দি এবং ওই জমির অতীত-বর্তমান সকল তথ্য থাকে। ওই জমিতে কী ঘর আছে, ম্যাপে সেটাও দেখা যাবে। জমির যে নকশা করা হয়েছে, তা ভুল হওয়ার পরিমাণ মিলিমিটার পর্যন্ত। যাতে ভুল না হয় এ জন্য জমির মালিকের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষাও করা হয়েছে, যেখানে ভুক্তিভোগী শতভাগ সন্তুষ্ট। ডিজিটাইজেশন করতে উদ্যোগুলো বাস্তবায়নে মানুষও তৈরি করতে হবে-এমন মন্তব্যের জবাবে ভূমি সচিব বলে, পেছনের মানুষগুলোকে রাতারাতি পরিবর্তন করার ম্যাজিক আমাদের হাতে নেই। এ জন্য আমরা সিসটেমগুলো সেইভাবে তৈরি করেছি, যাতে কোনো মানুষ ইচ্ছা করলেও সিসটেমের কারণে খারাপ কিছু করতে না পারে।
সংলাপে উপস্থিত ছিলেন ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনের (সিএসও) নেতৃবৃন্দ, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগীবৃন্দ, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা ভূমি সম্পর্কিত নানা ধরনের সমস্যার কথা তুলে ধরেন ও মতামত দেন।