সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন




প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই, তবে রোহিঙ্গাদের সামনে অনেক ‘কিন্তু’

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১৪ জুন, ২০২৩ ১০:২৬ am
Bhashan Char rohingya ভাষাণচর ভাষানচর ইউনিয়ন মিয়ানমার বার্মা উখিয়া রোহিঙ্গা Rohingya Refugee people Ethnic group Myanmar stateless Rakhine রাখাইন রোহিঙ্গা শরণার্থী জনগণ সংকট মিয়ানমার উচ্ছেদ বাস্ত্যুচ্যুত ক্যাম্প উখিয়া নাগরিক
file pic

২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রত্যাবাসনের প্রাথমিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা বলছেন, প্রত্যাবাসনের কোনও বিকল্প নেই। তবে এরইমধ্যে বেশ কিছু অভিযোগ নিয়ে সামনে এসেছেন রোহিঙ্গা নেতারা। তারা বলছেন, ওপারে ক্যাম্পে রাখা হলে আমরা যাবো না। প্রত্যাবাসনের উদ্যোগের সঙ্গে আমরা একমত, কিন্তু নিজের ভিটায় ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে। রোহিঙ্গারা বলছেন, আমরা প্রত্যাবাসন চাই, কিন্তু নাগরিকত্বের অধিকার দিতে হবে। এরইমধ্যে তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত মিয়ানমারের ক্যাম্প পরিদর্শন করে এসে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলছেন, আমাদের কোনও আগ্রহ নেই সেই ক্যাম্পে যাওয়ার। আমাদের নিবাস আরাকানে ছিল, সেগুলোই বুঝিয়ে দিতে হবে।

গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি তালিকা যাচাই-বাছাই করতে মিয়ানমারের একটি টেকনিক্যাল দল আসে। ২২ সদস্যবিশিষ্ট দলটি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সমাজ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অং মিয়োর নেতৃত্বে অভিবাসন ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা টেকনাফে আসেন এবং প্রত্যাবাসনের তালিকায় থাকা বেশ কিছু রোহিঙ্গা পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-নয়াপাড়া ক্যাম্পে বসবাসকারী ৭০ জন রোহিঙ্গাকে টেকনাফ স্থলবন্দরের ভেতরে রেস্টহাউজের সামনে তৈরি করা প্যান্ডেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমার দলের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের নাম, পরিচয়, ঠিকানা, পেশা ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য নেন। এ সময় রোহিঙ্গারা বলেছেন, তারা তাদের নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান; তবে ক্যাম্পে নয়।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমারকে ৮ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা দেওয়া হয়। এরপর মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ৬৮ হাজার রোহিঙ্গার একটি ফিরতি তালিকা পাঠানো হয় বাংলাদেশকে। দেখা যায় মিয়ানমারের ওই তালিকায় একই পরিবারের কোনও কোনও সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্তির পর পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়েছে বলে তালিকায় তাদের নাম নেই, নাকি অন্য কোনও কারণে একই পরিবারের কেউ কেউ বাদ পড়ে গেছেন, এসব যাচাই করতেই মিয়ানমার দলটি এসেছিল।

তবে বালুখালী ক্যাম্প-৯-এর এক রোহিঙ্গা শিক্ষকের পরিবার এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ওপারের ক্যাম্পে থাকার কোনও যুক্তি আমরা পাই না। বিশেষ পরিস্থিতিতে এপাড়ে এসেছি আমরা, কিন্তু ফিরবো নিজ ভিটাতেই। নইলে ফিরবো না। ওপারের ক্যাম্পে না আছে আত্মসম্মান, না আছে নিরাপত্তা। ওখানে আন্তর্জাতিক সহায়তা কীভাবে কতটা আসবে, আর কতটা আমরা পাবো কিছুই নিশ্চিত না। জেনেশুনে সবাই মিলে এতগুলো মানুষকে এমন অনিশ্চয়তায় ফেলবেন না।’

এর আগে রোহিঙ্গাদের ২০ জনের একটি দলকে একটি ট্রলারে করে টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের নাগপুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নাগপুরা থেকে একটি গাড়িতে করে তাদের নেওয়া হয় মংডু এলাকার বলিবাজার ক্যাম্পে। মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নিতে কী আয়োজন করেছে, সেটা দেখে এসে প্রতিনিধি দলের একজন জানান, প্রায় সাড়ে ১১শ’ মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই ক্যাম্পের ঘরগুলো দোতলা, টিন দিয়ে তৈরি। একেকটা ঘরের দৈর্ঘ্য আট থেকে বারো হাত। প্রতিটি বাসায় চার-পাঁচ জনের একটি পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কিন্তু নিজের দেশে গিয়ে ক্যাম্পে থাকার বিষয়ে তাদের আপত্তি ইতোমধ্যে জানিয়েছেন তারা। পরিদর্শনকারীদের কাছ থেকে পরিবেশ পরিস্থিতি জেনেছেন—কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা নারীরা। ফিরে যেতে চাই উল্লেখ করে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘নিজ দেশে ফিরে আবার ক্যাম্প? আমাদের তো সবার জায়গা জমি ছিল। আমরা যে আরাকানের আদি নিবাসী, এটা প্রমাণিত সত্য। আমরা পালিয়ে এপাড়ে চলে এসেছি। তাহলে ফেরার সময় আমাদের জমিগুলো কোথায় গেলো? ক্যাম্পে কেন?’

আরেক নারী ইয়েসমিন বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি ওখানেও ক্যাম্প থেকে বের হতে হলে আমাদের বিশেষ একটি অনুমতিপত্র নিতে হবে। ক্যাম্প এলাকার বাইরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বের হতে দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট সময় শেষে আবারও ক্যাম্পেই ফিরতে হবে। আমরা তো সেখানকার নাগরিক, আমাদের কেন এরকমভাবে রাখা হবে?’

২০১৭ সালে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে পালিয়ে আসেন। এরপর থেকে তাদের মিয়ানমারের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গা শরণার্থীও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসিত হননি। প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের তালিকা আদান-প্রদান শেষে একটি পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রায় সাড়ে ১১শ’ রোহিঙ্গার একটি তালিকা নিয়ে কাজ শুরু হয়। এই তালিকা ধরেই যাচাই-বাছাইয়ে মিয়ানমার প্রতিনিধি দল টেকনাফ এসেছিল। তাদের কাজের আপডেট জানতে চাইলে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামসুদ্দৌজা বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে একটি তালিকা দিয়েছিলাম। তালিকা বানানোর পরে বেশ কিছু পরিবারে লোকসংখ্যা বেড়েছে। সেসব কারণে তালিকা যাচাই করতে এসেছিল। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি, এখানে পরবর্তী কোনও আলাপ হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিকল্প আমাদের কাছে নেই। কীভাবে শুরু করা যাবে, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।’

নিজ নিজ ভিটায় ফিরে যাওয়ার দাবিতে গত ৮ জুন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যে জনসভা হয়, সেখানে নেতারা দাবি করেন—তাদের জায়গা ও জমি ফেরত দিতে হবে। তারা ক্যাম্পে যাবেন না। প্রত্যাবাসন পদ্ধতিতে তাদের কথা বলার সুযোগ নেই।

আসলেই রোহিঙ্গা নেতাদের এই দাবি সঠিক কিনা প্রশ্নে সামসুদ্দৌজা বলেন, ‘এটা ঠিক না। ওদের জন্য প্রস্তুত জায়গা পরিদর্শনে তাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো হয়েছে। ওপার থেকে মানুষ আসছে, আন্তর্জাতিক মহল মনিটরিং করছে। সবাই তো রোহিঙ্গাদের নিয়েই ভাবছে, তাদের কথা শুনছে।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD