আবহাওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশ যেতে চান ১৫ কর্মকর্তা। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ফলে প্রত্যেকের জন্য খরচ পড়বে ৮ লাখ টাকার বেশি।
এছাড়া ‘পার্সোনাল অ্যান্ড ওভারহেড ইনডাইরেক্ট কস্ট ফর জাইকা’ নামক খাতে প্রস্তাবিত ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা। সেই সঙ্গে ভ্রমণ ব্যয় বাবদ ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকাসহ নানা ব্যয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে যাচ্ছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
‘স্ট্রেনদেনিং দ্য ক্যাপাসিটি অব ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট সার্ভিস’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে এমন প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এই প্রকল্পটি নিয়ে আগামী ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। সেখানে এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বৃহস্পতিবার বলেন, কী প্রশিক্ষণ, কাদের জন্য এবং প্রকল্পের জন্য কতটা সহায়ক হবে এসব না ভেবে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের সুযোগ রাখাটা ঠিক নয়। কেননা এটা অপচয়ের দুয়ার খুলে রাখার মতো হবে।
অনেকেই বলেন বিদেশ গেলে চোখ খুলে যায়, অনেক কিছু শেখা যায়। এসব যুক্তি তো ৫০ বছর আগের। সেটিও হতে পারে যারা কখনো বিদেশে যাননি তাদের জন্য। কিন্তু এখন তো চোখ খুলতে বিদেশ যেতে হয় না। সবকিছুই হাতের মুঠোয়। কিন্তু যেকোনো প্রকল্প হলেই বিদেশে প্রশিক্ষণ রাখাটা একটা রীতির মতো হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে জাইকার জন্যই ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখাটা কতটা যৌক্তিক সেটি ভাবতে হবে। কেননা যতই অনুদানের টাকা হোক। এটি তো সরকার নিচ্ছে। যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে সেটি কতটা পূরণ হবে বা দেশ কী পাবে তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৩ কোটি ৩৫ লাখ এবং জাইকার (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি) অনুদান থেকে ২৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। প্রক্রিয়াকরণ শেষে প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালে কক্সবাজার ও খেপুপাড়ায় দুটি পুরাতন রাডার স্থাপনের মাধ্যমে আবহাওয়া ক্ষেত্রে জাপান সরকারের আর্থিক সহযোগিতা কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে জাপানের আর্থিক সহায়তায় ওই রাডারে মাইক্রোওয়েভ লিংকের মাধ্যমে রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণের জন্য ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আবহাওয়া পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা সেবার উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। তীব্র কালবৈশাখী ও বজ ঝড় পর্যবেক্ষণের জন্য রংপুরে একটি নতুন রাডার স্থাপন, ঢাকায় পুরাতন রাডারের প্রতিস্থাপন এবং স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড রিসিভিং স্টেশন স্থাপন করা হয়।
পরবর্তীতে ২০০৭-২০১০ সময়ের মধ্যে কক্সবাজার ও খেপুপাড়ায় পুরোনো রাডার দুটিতে আধুনিক ডপলার রাডার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের মতো ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিনিয়ত আবহাওয়ার প্রকৃতি ও তীব্রতায় বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে।
এজন্য অধিক কার্যকর, সঠিক স্থান ও সময়ভিত্তিক আবহাওয়া পূর্বাভাস বা সতর্কবার্তা প্রয়োজন। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার স্থাপনের পাশাপাশি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কাজে নিয়োজিত জনবলের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এজন্যই ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য ক্যাপাসিটি অব ওয়েদার অ্যান্ড ক্লাইমেট সার্ভিস’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
পিইসি সভায় কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পে ‘পার্সোনাল অ্যান্ড ওভারহেড ইনডাইরেক্ট কস্ট ফর জাইকা’ শীর্ষক খাতে প্রস্তাবিত ১৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। কিন্তু ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) এ খাতের বিস্তারিত ব্যয় বিভাজন যুক্ত করা হয়নি। পিইসি সভায় এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হবে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১৫ জনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাবদ ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী কারা হবেন তার বিস্তরিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে জানতে চাওয়া হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ৭০টি ভ্রমণ ব্যয় বাবদ ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। এছাড়া এ খাতে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের প্রস্তাবে কোনো ক্রয় পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। ডিপিপিতে ক্রয় অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের পদবি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে ক্রয় পরিকল্পনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রকল্প প্রস্তাবে ৩০০টি সেমিনার বা কনফারেন্স বাবদ ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের জন্য সভায় তুলে ধরা হবে।
আরও যেসব খাতের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে সেগুলো হচ্ছে-সম্মানি ভাতা, সাধারণ খরচ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন, পরিবহণ ব্যয় এবং জ্বালানি ও গ্যাস বাবদ ব্যয়। আরও আছে কম্পিউটারসামগ্রী, ল্যাপটপ, ফার্নিচার খাতের ব্যয়।