মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়লেও আগামী জুন পর্যন্ত দেশের জ্বালানি আমদানিতে তাৎক্ষণিক শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার টু সরকার চুক্তি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চুক্তি সম্পন্ন রয়েছে। বিকল্প রুট ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক দামের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ– এই তিনটি ঝুঁকি বড় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিপিসি জানিয়েছে, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অপরিশোধিত তেল আসছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। অতীতে এসব চালান মূলত হরমুজ প্রণালি হয়ে এলেও এখন বিকল্প সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি রাখা হয়েছে। বছরে বিকল্প রুটে আনার প্রস্তুতি রয়েছে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল।
বিপিসির হাতে প্রায় ৩০ দিনের কৌশলগত মজুত রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন করা হয়। আমদানি প্রিমিয়াম আগেই নির্ধারিত থাকায় তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপ পড়ছে না। তবে স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে ভবিষ্যৎ চালানে ব্যয় বাড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে জাহাজ চলাচলে বীমা ব্যয় বাড়বে, পরিবহন সময় দীর্ঘ হবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, যা সরাসরি মূল্যে প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি তেলের আপাতত সংকট না হলেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা এলএনজির প্রায় পুরোটাই আসছে হরমুজ প্রণালি হয়ে। ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়তে পারে আমদানি ব্যয়, যা সরাসরি বিদ্যুৎ ও শিল্পকারখানার উৎপাদনকে প্রভাবিত করবে।
ব্যারলপ্রতি দাম সেঞ্চুরি করতে পারে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যেখানে ব্যারেলপ্রতি দাম ছিল ৬১ ডলার, তা বেড়ে বর্তমানে ৬৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টা ক্রুড ও মারবান ক্রুডের দাম ছিল ৭৩ থেকে ৭৪ ডলার। হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ১৮ থেকে ১৯ মিলিয়ন ব্যারেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যকে টালমাটাল করে দিতে পারে।
ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজ বলেছে, হরমুজ প্রণালি অচল হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে ইরানের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ। সরবরাহের প্রতি ১ শতাংশ বিঘ্নে দাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস আগেই সতর্ক করেছিল, বড় ধরনের অবরোধ হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। সংস্থাটির মতে, আংশিক বিঘ্নের ঝুঁকি থাকলেও ব্যারেলপ্রতি ২০ থেকে ৪০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হওয়ার নজির রয়েছে।
বাংলাদেশের ঝুঁকি
বিপিসির পরিচালনা ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক এ কে এম আজাদুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছর দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৬৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। এই জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়। কৃষি, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহন এই তেলের প্রধান ভোক্তা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি তেলের দামে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার চলাচলেও এই রুট ব্যবহৃত হয়। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ যে পণ্য রপ্তানি করে, সেগুলোর পরিবহনেও ব্যয় বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা-যাওয়া করা জাহাজের ভাড়া কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের প্রভাব পড়বে পুরো দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। তেলের দামের সঙ্গে বিদ্যুতের সম্পর্ক আছে, বিদ্যুতের সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন খরচ যুক্ত। সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নিলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়বে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে কৃষক, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাহাজ পরিচালন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বাজারে।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে কারখানা পরিচালনার খরচ বাড়বে। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে রপ্তানিতে বড় ধাক্কা আসবে। আগে লোহিত সাগর সংকটে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে পণ্য পাঠাতে খরচ এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছিল এবং সময় লেগেছিল দুই থেকে তিন সপ্তাহ বেশি। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব নতুন বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে সেই বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারকে দুটি বিকল্পের মুখোমুখি হতে হবে; ভর্তুকি বাড়ানো অথবা খুচরা মূল্য সমন্বয় করা। ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট ঘাটতি ও ঋণচাপ বাড়বে। মূল্য সমন্বয় করলে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।
রিজার্ভে চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানি বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন চাপ তৈরি হবে। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের পর দুই বছরে দেশের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ বিলিয়নের নিচে নেমে এসেছিল। একই পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা নতুন সরকারকে বাড়তি চাপে ফেলবে।
এলএনজি আমদানি ঝুঁকিতে
গ্যাস সংকটে নাকাল অবস্থা, আমদানি করেও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না ঘাটতি। এরপর এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। সংঘাত বিস্তৃত হলে এলএনজি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। স্পট মার্কেটে এলএনজি গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। সামনে গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিতে পারে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিধি বাড়ানো এবং বিকল্প উৎস, যেমন– আফ্রিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
বর্তমানে দেশীয় উৎস থেকে আসে দৈনিক ১৭১ কোটি ঘনফুট আর আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, তাৎক্ষণিক স্বস্তি থাকলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বিকল্প সরবরাহ পথ সক্রিয় রাখা, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যচুক্তি জোরদার করা, কৌশলগত মজুত বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। samakal