গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে ইরান। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প— উভয়েই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আরাগচি জানান, ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষিতে প্রণালীটি ‘সম্পূর্ণভাবে খোলা’ হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এ ঘোষণা সমর্থন করলেও দাবি করেন, ইরান নাকি ‘আর কখনো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করবে না’। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকবে।
এদিকে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে প্যারিসে প্রায় ৪০টি দেশের অংশগ্রহণে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের সংঘাত শেষ হলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তারা ভূমিকা রাখবে।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় খোলায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলো—
যুক্তরাষ্ট্র
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, প্রণালি ‘সম্পূর্ণ খোলা এবং স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রস্তুত’ তবে ইরানকে ঘিরে নৌ অবরোধ চুক্তি সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে।
পরে তিনি আরও জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি ‘খুব কাছাকাছি’ এবং বড় কোনো অচলাবস্থা নেই।
ইরান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, ১০ দিনের ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধবিরতির সময় পর্যন্ত প্রণালি খোলা থাকবে।
তবে দেশটির কিছু রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। এক ইরানি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, শুধুমাত্র অ-সামরিক জাহাজগুলোই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে পারবে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এ বিষয়ে নীরব রয়েছে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাজ্য
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্যারিস বৈঠকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে যৌথভাবে নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, প্রণালি খোলার বিষয়টি ‘স্থায়ী ও কার্যকর’ হতে হবে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স একটি ‘শান্তিপূর্ণ ও প্রতিরক্ষামূলক’ বহুজাতিক মিশনে নেতৃত্ব দেবে।
ফ্রান্স
ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আমরা সবাই হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে, সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়ার দাবি জানাই। ‘ সেইসঙ্গে তিনি প্রণালিকে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা টোল ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করেন।
জার্মানি
চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ জানান, জার্মানি মাইন অপসারণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিতে পারে, তবে এর জন্য সংসদের অনুমোদন ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো একটি শক্ত আইনি ভিত্তি প্রয়োজন।
ফিনল্যান্ড
প্রেসিডেন্ট আলেকজন্ডার স্টাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রণালি খোলার ঘোষণাকে স্বাগত জানান। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কূটনীতি প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস হরমুজ প্রণালি খোলার ঘোষণাকে স্বাগত জানান এবং এই পদক্ষেপকে ‘সঠিক দিকে অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, প্রণালি পুনরায় চালুর ঘোষণাটি সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ ও স্বাধীন নৌ চলাচলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে।
শিপিং কোম্পানির প্রতিক্রিয়া
নরওয়ের শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানায়, মাইন থাকার সম্ভাবনা, ইরানের শর্ত এবং বাস্তব প্রয়োগ—এসব বিষয় পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ।
আর জার্মানির হাপাগ-লয়েড এবং ডেনমার্কের মেয়ার্স্কও জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আপাতত প্রণালি ব্যবহার থেকে বিরত রয়েছে।
বাজারের প্রতিক্রিয়া
ইরানের হরমুজ প্রণালি ঘোষণার পরপরই তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার আশা জাগিয়েছে, যদিও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা