মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৮ অপরাহ্ন




২৪ কার্টন পড়ে আছে মানবাধিকার কমিশনে

২৪ কার্টন পড়ে আছে মানবাধিকার কমিশনে: ঝুঁকিতে গুম কমিশনের স্পর্শকাতর তথ্যপ্রমাণ

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২৭ am
NHRC এনএইচআরসি জামাকন National Human Rights Commission of Bangladesh জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
file pic

সদ্যবিলুপ্ত গুম কমিশনের অতি গোপনীয় নথিপত্র এবং বেশকিছু স্পর্শকাতর তথ্যপ্রমাণ একধরনের সংরক্ষণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আইনগতভাবে কোন দপ্তরে এসব গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করা হবে, এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও নেই। এ কারণে এসব আলামত অনেকটা অভিভাবকহীনভাবে মানবাধিকার কমিশনে পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি কোনো কারণে এসব তথ্যপ্রমাণ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে খোয়া যায়, তাহলে গুম সংক্রান্ত মামলার তদন্ত ও বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে সত্যিকারার্থে যারা গুমের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ডকুমেন্ট নতুন করে সংগ্রহ করা কঠিন হবে।

গুম কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন-এমন দায়িত্বশীল সূত্র পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলে, ‘গুম সংক্রান্ত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান ও জেরায় প্রাপ্ত অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। কিন্তু তারা যখন এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন অনেকটা হঠাৎ করে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে তাদের ফুল কমিশনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এসব গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের কারণে প্রভাবশালী অনেকে ফেঁসে যেতে পারেন, সেহেতু কার্টনভর্তি এসব ডকুমেন্ট যে কোনো সময় গায়েব হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তো থাকতেই পারে।’

গুম কমিশনের নথিপত্র সংরক্ষণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী সম্প্রতি বলেন, ‘বিলুপ্ত গুম কমিশনের নথিপত্র এবং গোপনীয় দলিল-দস্তাবেজ মানবাধিকার কমিশনের সচিবের জিম্মায় থাকার কথা। সুনির্দিষ্ট গন্তব্য চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নথিপত্র তার হেফাজতেই থাকবে-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে এগুলো কোথায়-কীভাবে আছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারছেন না।’

যা আছে ২৪ কার্টনে : আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রভাবশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ছাড়াও সামরিক, বেসামরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাকে গুম কমিশনে তলব করা হয়। তাদের কেউ কেউ লিখিত বক্তব্য পাঠান, কেউ আবার সশরীরে হাজির হন। এ সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক একাধিক মহাপরিচালক, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং র‌্যাব ও পুলিশের সাবেক উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদের অডিও-ভিডিও রেকর্ড করা হয়। এছাড়া গুম কমিশনের বিশেষ অনুসন্ধান টিম র‌্যাব এবং ডিজিএফআই পরিচালিত একাধিক গোপন বন্দিশালা থেকেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও তথ্যপ্রমাণ উদ্ধার করে।

সূত্র জানায়, হাসিনা সরকারের বিশেষ আস্থাভাজন কর্মকর্তা এবং ডিজিএফআই-এর সাবেক প্রভাবশালী মহাপরিচালক (ডিজি) লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন কমিশনে হাজির হন। এ সময় তিনি গুমের একাধিক ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করে দেন। এছাড়া র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য গুম ও খুনের একাধিক ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে সাক্ষ্য দেন। এর বাইরে গুমের শিকার একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগও রেকর্ড করা হয়।

জানা যায়, সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি ছাড়াও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা, র‌্যাব, ডিবি, সিটিটিসিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দপ্তর থেকেও বেশকিছু গোপন নথিপত্র উদ্ধার করে কমিশন। এসব বন্দিশালা অবিকৃত অবস্থায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে পরবর্তী সময়ে চিঠিও দেয় গুম কমিশন। অনুসন্ধানে বেশকিছু ফোনকল রেকর্ড, এসএমএস এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া যায়, যেখানে অপরাধের সঙ্গে বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। বিলুপ্তির পর গুম কমিশনের সাবেক সচিব কুদরত-ই-এলাহীকে মানবাধিকার কমিশনের সচিব করা হয়। ফলে তিনি গুম কমিশনের দলিলপত্র মানবাধিকার কমিশনে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। একপর্যায়ে গুম কমিশনের সাবেক কমিশনারদের মতামতের ভিত্তিতে দাপ্তরিক ফাইল ছাড়াও ডকুমেন্টভর্তি ২৪টি কার্টন কাওরানবাজারে মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া তদন্তকাজে কমিশনারদের ব্যবহৃত ৫টি ল্যাপটপ থেকে সব তথ্য মুছে সেগুলো সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, গুম কমিশনে ব্যবহৃত ল্যাপটপ থেকে তথ্য মুছে দেওয়া হলেও যে কোনো সময় ফের সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব। ফলে ফিরিয়ে দেওয়া ল্যাপটপগুলো কোনোভাবে বেহাত হলে গোপনীয় তথ্য ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সেক্ষেত্রে গুমের শিকার ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী এবং সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বিশেষ করে শৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মরতদের নানা ধরনের ঝামেলায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

মানবাধিকার কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, গুম কমিশনের নথিপত্র যেভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, গুম কমিশনের নথিপত্র সংরক্ষণের দায়িত্ব মানবাধিকার কমিশনের নয়। তাছাড়া বিগত কমিশন থেকেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সাবেক কমিশনের মাত্র দুমাসের মেয়াদকালে দুটি কমিশন সভা (১১২ ও ১১৩ তম) অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণীতেও এ সংক্রান্ত নির্দেশনার কোনো উল্লেখ নেই। তাই এসব গুরুত্বপূর্ণ আলামত নিয়ে তারাও নানারকম ঝুঁকির মধ্যে অফিস করছেন। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সরেজমিন যা দেখা গেল : সোমবার দুপুরে কাওরানবাজারে মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়ে গেলে একজন কর্মকর্তা গুম কমিশনের দলিলপত্র রাখার কক্ষটি দেখিয়ে দেন (৯১৭ নম্বর কক্ষ)। কাচঘেরা কক্ষটির দরজায় ছোট একটি সাধারণ তালা ঝুলছে। বাইরের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় ভেতরে স্তূপ করে রাখা পুরোনো ফাইল, কাগজপত্র এবং দড়ি বাঁধা বেশকিছু কার্টন। সেখানে তেমন কোনো বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থাও নেই। পাশের কক্ষগুলোয় কমিশনের অন্য কর্মকর্তারা স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ করছেন।

এ প্রসঙ্গে জানার জন্য কমিশনের সচিব কুদরত-ই-এলাহীর কক্ষে গেলে তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত হয়েছিল বিলুপ্তির পর গুম কশিনের অভিযোগ এবং তদন্ত মানবাধিকার কমিশনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু মানবাধিকার এবং গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় একধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে গুম কমিশনের এসব দলিল-দস্তাবেজের বিষয়ে সরকার হয়তো শিগ্গিরই কোনো সিদ্ধান্ত দেবে। অথবা মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন হলে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

গুম কমিশনের নথিপত্র নিয়ে উদ্ভূত জটিলতার কারণে কোনো ধরনের ভয় বা উদ্বেগ অনুভব করেন কি না-এমন প্রশ্ন করা হলে সাবেক কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘ঠিক ভয় নয়, তবে এসব নিয়ে আমাদের একটা উদ্বেগ তো অবশ্যই আছে। বাস্তবতা হলো-গুমের শিকার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের তুলনায় আমাদের এই ভয় বা উদ্বেগ তেমন কিছুই না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গুম কমিশনের এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কী করে, সেটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর এক নির্বাহী আদেশে গুম কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। গুলশানের ৯৬ নম্বর বাড়িতে কমিশনের অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করা হয়। অসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গুম কমিশনের সদস্য ছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, সাজ্জাদ হোসেন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাবিলা ইদ্রিস। তবে গুম কমিশন বিলুপ্তির পর কমিশনের ৩ জন সদস্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের পর তারাও দায়িত্ব পালন থেকে সরে দাঁড়ান।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD