এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম মানভেদে প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশের বাজারে উল্টো বেড়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত। একইভাবে পাম অয়েল, মসুর ডাল, রসুনসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও বাংলাদেশে তা বেশি রয়েছে। সরকারের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে বাজার মনিটরিং জোরদার এবং উৎপাদন খরচ কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছর আগে বিশ্ববাজারে ৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ছিল প্রতি টন ৫২৯ ডলার, যা গত ১৯ এপ্রিল কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ ডলারে। কমেছে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। একইভাবে ১৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ৫২০ ডলার থেকে নেমে ৪২৩ ডলারে এসেছে। কমেছে ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ।
কিন্তু দেশের বাজারে মোটা চাল (স্বর্ণা) উল্টো বেড়েছে। এক বছর আগে এ চালের দাম ছিল ৫২ থেকে ৫৭ টাকা, যা ১৯ এপ্রিল বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ । পাশাপাশি মাঝারি মানের (পাইজাম) চালের দামও এক বছরে প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার সুফল না পাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো উচ্চস্থানীয় উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত প্রতিযোগিতা। তাঁর মতে, দেশের চাহিদার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে পূরণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক দামের প্রভাব সরাসরি পড়ে না। পাশাপাশি আমদানিকারকদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক বাজারের কম দামের সুবিধা ভোক্তাদের না দিয়ে স্থানীয় বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশি মুনাফা করে।
তিনি আরও বলেন, আমদানিতে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকায় এক ধরনের অঘোষিত সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, যা বাজারে প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে তিনি আমদানি প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করা, সময়মতো আমদানি নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
আরও কয়েকটি পণ্যের চিত্র
বিশ্ববাজারে পাম অয়েলের দাম এক বছরে প্রায় ১২ শতাংশ কমলেও দেশে বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সয়াবিন তেলের দাম বিশ্ববাজারে প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। দেশে বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। মসুর ডালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশে তার প্রতিফলন নেই। রসুনের দাম বিশ্ববাজারে ৩২ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশে দেশীয় রসুনের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে আমদানি করা রসুনের দাম দেশে এক বছরে ৯ শতাংশ কমেছে। এদিকে আদার দাম বিশ্ববাজারে মাত্র ৭ শতাংশ বাড়লেও দেশে তা বেড়েছে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত।
টাস্কফোর্সের পর্যবেক্ষণ
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। তবে দাম কমলে দেশের বাজারে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন স্বাভাবিক। আমদানি ও এলসি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ পণ্যের আমদানি সামান্য কমলেও ঈদুল আজহা উপলক্ষে মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি কিছুটা বেড়েছে। আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও বিনিময় হার স্থিতিশীল।
মাসিক ভিত্তিতে রসুন, আদা ও দারুচিনির দাম বেড়েছে । বার্ষিক ভিত্তিতে চাল, তেল, দেশীয় রসুন, জিরা ও লবঙ্গের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চাহিদার তুলনায় কিছু পণ্যের আমদানি কম থাকলেও বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, এসব পণ্যের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বিদ্যমান।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত
অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে টাস্কফোর্স সুপারিশ করেছে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মজুতদারির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, লবণ, আদা, রসুন, জিরা, গরম মসলা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, তেজপাতা, লেবু, শসা, কাঁচামরিচসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মসলা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমদানি বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সভা আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। কোরবানির পশু পরিবহন ও বিপণন স্বাভাবিক রাখতে বাজার তদারকি জোরদার এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে লবণের সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজারে মূল্য হ্রাসের সুবিধা দেশের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর তদারকি ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নিত্যপণ্যের মজুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল। কোনো পণ্যের সংকট নেই। বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলেও খোলা সয়াবিনের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে বাজারে। তিনি বলেন, নির্ধারিত দামের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি সরকার নজরে রেখেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকার বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি বরদাশত করবে না। এটি ১৮ কোটি মানুষের দেশ। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বাজারকে জিম্মি করতে পারবে না। সমকাল