স্থানীয় সরকারের এক হাজার চারশর বেশি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে উপযুক্ত। এসব নির্বাচন আয়োজনে আইনগত কোনো বাধা নেই। সীমানা বা মামলাজনিত জটিলতাও নেই। নির্বাচন কমিশন (ইসি) চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যে সময়সীমা আইনে উল্লেখ রয়েছে, তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ইসির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কমিশন সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনসংক্রান্ত যে তথ্য পাঠিয়েছেন, সেখানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ইসি সূত্র বলছে, এসব নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইসিকে চিঠি দেয়নি। এ কারণে ইসিও তফসিল ঘোষণা করতে পারছে না। সরকারের সবুজ সংকেত পেলে নির্বাচন আয়োজনের পর্দা উন্মোচন হবে। স্থানীয় সরকারের কোন নির্বাচন আগে হবে, সেটিও জানিয়ে দেবে ইসি। তবে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই ইসি। সরকার বলামাত্রই তফসিল ঘোষণা করতে বেশি সময় নেবে না।
নির্বাচন উপযোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে-১২টি সিটি করপোরেশন, ৪৫০টির বেশি উপজেলা পরিষদ, তিনশর বেশি পৌরসভা, প্রায় ছয়শ ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৬১টি জেলা পরিষদ। এছাড়া আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আরও দুই হাজার আটশর বেশি ইউনিয়ন পরিষদ তফসিল ঘোষণার জন্য উপযোগী হবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করছি। পুরো তথ্য পাওয়ার পর নির্বাচনের কাজ শুরু হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নাকি উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদ-কোনটির ভোট আগে হবে; আর কোনটি পরে হবে-তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আমরা আমাদের প্রস্তুতি এগিয়ে রাখছি।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের চাপে রয়েছে সরকার। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের পর যত সংখ্যক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী হবে, ততই চাপ বাড়তে থাকবে। এমনকি বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই নির্বাচনি আগাম প্রচার চালাচ্ছেন। যদিও সরকার চলমান এসএসসিসহ পাবলিক পরীক্ষা ও বর্ষা মৌসুম বিবেচনায় বছরের শেষদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন শুরু করতে চায়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক জনপ্রতিনিধি পালিয়ে যাওয়া, অনেকে আটক হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেয় ওই সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক পদে আমলাদের সরিয়ে নিজ দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেয়। নির্বাচন না দিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়। এমনকি দলীয় প্রশাসক নিয়োগের মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রলম্বিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে কি না-এমন প্রশ্নও তোলে বিরোধী দল। এরপর সমালোচনার মুখে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে সরকার।
ইসি সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সারা দেশের সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ নির্বাচন, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, তফসিল ঘোষণার ক্ষণগণনার সময়সীমা এবং ভোটগ্রহণে আইনগত বাধা আছে কি না-তা জানতে চায় ইসি। ওই চিঠির জবাবে মাঠ কর্মকর্তারা সারা দেশের এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য ইসিতে পাঠিয়েছে। ওইসব তথ্য একীভূত করছেন ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদ অন্তর্বর্তী সরকার ভেঙে দেয়। আইনে পরিষদ ভেঙে দেওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সংসদের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে নির্ধারিত সময়ে ভোট হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত এসব নির্বাচনের সবুজ সংকেত দেয়নি। তারা আরও বলেন, এসব নির্বাচন আয়োজনের জন্য মালামালও কেনা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য বাজেটও ধরা আছে। অর্থাৎ ইসির সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। তবে বিধিমালা সংশোধনের কাজ এখনো শুরু করেনি।
সিটি করপোরেশন : মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনে কোনো ধরনের আইনি জটিলতা নেই। সবগুলো সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপযোগী বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির মেয়াদ ২০২৫ সালের ২ জুন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়াদ একই বছরের ১ জুন শেষ হয়েছে। আর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মধ্যে ২০২৭ সালে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন, ২০২৮ সালের বিভিন্ন সময়ে সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনা এবং ২০২৯ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু মেয়র অপসারণ করায় ওই পদ আগেই শূন্য হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক আদেশে ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী মেয়রদের অপসারণের পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে হয়নি। বর্তমানে বিএনপিদলীয় নেতারা প্রশাসক হিসাবে রয়েছেন।
জেলা ও উপজেলা পরিষদ : প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেশের ৬১টি জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনে কোনো ধরনের জটিলতা বা আইনগত বাধা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব পরিষদের চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সদস্য ও সাধারণ সদস্যদের অপসারণ করা হয়। জেলা পরিষদগুলো ভেঙে যাওয়ায় এগুলো ইতোমধ্যে নির্বাচন করার আইনগত এখতিয়ারে রয়েছে। তবে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে ২০২২ সালে নির্বাচন হয়নি।
প্রায় একই ধরনের তথ্য এসেছে উপজেলা পরিষদের ক্ষেত্রেও। ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে কয়েকটি ছাড়া বাকি সব নির্বাচন উপযোগী বলে প্রতিবেদন দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে কয়েকটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এর মধ্যে মাদারীপুরের নবগঠিত উপজেলা ডাসার সীমানা নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা তৈরি হয়নি। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় সর্বশেষ ২০০৯ সালে নির্বাচন হয়েছে। উচ্চ আদালতে রিট চলমান থাকায় এ উপজেলায় আর ভোট হয়নি। আইনগতভাবে এখানে নির্বাচন করার বাধা আছে।
পৌরসভা নির্বাচন : দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে কয়েকটি ছাড়া বাকি সবই নির্বাচন উপযোগী। অন্তর্বর্তী সরকার পৌরসভা মেয়রদের অপসারণ করায় সেগুলোতে নির্বাচন করতে বাধা নেই। তবে কয়েকটি পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এর মধ্যে পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া পৌরসভার সীমানা নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার নারায়ণপুর ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী পৌরসভায়। এছাড়া হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ পৌরসভা নিয়েও আইনি জটিলতা রয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন : ইসি সূত্র জানায়, দেশে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ৬শ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের উপযোগী। ইসি চাইলে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তফসিল এখনই ঘোষণা করতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিন বা ৬ মাসের মধ্যে ভোট করার আইনি বিধান রয়েছে। ওই সময়সীমা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
এছাড়া আগামী মে মাসে আরও এক হাজার ১৪৪টি, জুন মাসে ৯৮৩টি ও জুলাই মাসে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ক্ষণগণনা শুরু হবে। চলতি বছরের বাকি সময় অর্থাৎ আগস্ট মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে আরও আট শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের উপযোগী হবে। ওই সময়সীমা শুরুর পর ওইসব ইউনিয়ন পরিষদেরও তফসিল ঘোষণা করতে পারবে ইসি। বাকিগুলোর মধ্যে ২০২৭ সালে ২৩৫টি, ২০২৮ সালে ৪৪টি ও ২০২৯ সালে ২২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন উপযোগী হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করলেও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণ করেনি। এ কারণে যেসব ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ আগে শেষ হচ্ছে, সেগুলো আগে ভোট করতে পারবে ইসি।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০২১ ও ২০২২ সালে সারা দেশে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
(যুগান্তর)