কুরবানির ঈদের আগে বাজারে পণ্যের বাড়তি দামে অস্বস্তিতে ছিলেন ভোক্তা। ঈদ ঘিরেও ছিল অসহনীয় দাম। ঈদের পর বাজার তদারকিতে গাফিলতি করায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নতুন করে বাড়াচ্ছে পণ্যের দাম। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও সবজির দাম কমছে না। সবজির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকার উপরে। ডিমের দাম কমলেও সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। গত বছর এ সময়ের তুলনায় প্রতি কেজি চাল বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৮ টাকা বাড়তি দামে। এছাড়া ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে আটা-ময়দা ও মসলাপণ্য বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আয় না বাড়লেও বাজারে বাড়তি মূল্যের ব্যয়ের বোঝা চাপছে ভোক্তার ওপর।
গত তিন মাস আগে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মৌসুমেও বাড়ানো হয়েছিল চালের দাম। এখনো তা কমার কোনো লক্ষণ নেই। খুচরা বাজারে এক কেজি মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকায়। যা গত বছর একই সময় ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি মাঝারি মানের চালের মধ্যে-পাইজাম ও বিআর-২৮ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৮ টাকা। যা আগে ৬০-৬২ টাকা ছিল। গরিবের মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা দরে। যা আগে ৫৫ টাকা ছিল। শুক্রবার কাওরান বাজারে কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে। বাজারে চাল কিনতে এসে তিনি বলেন, আর কিছু কিনি বা না কিনি পরিবারের সবার জন্য চাল কিনতেই হবে। কিন্তু গত বছরের তুলনায় বাজারে চালের দাম অনেক বেশি। প্রতিবছর এই দাম বাড়তেই থাকে। ২ বছর আগেও প্রতি কেজি মিনিকেট ৭৫ টাকা দিয়ে কিনতাম। গত বছর দাম ছিল ৮০ টাকা। আর এখন ৮৫ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। বাজারে চাল ছাড়াও অন্যান্য সব পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা ভারী হচ্ছে। কিন্তু আয় আর বাড়ছে না। কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি ও খুচরা চাল বিক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মিলারদের কারসাজি কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। তারা গত মৌসুমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়িয়েছে। তবে কিছুটা কমালেও গত বছর একই সময়ের তুলনায় বাড়তি দরে বিক্রি করছে মিলাররা।
যে কারণে আমাদের মিল থেকে বেশি দামে এনে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ঈদের পর খুচরা বাজারে সবজি বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি দেশি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৭০ টাকা, দেশি গাজর ১৬০ টাকা, চায়না গাজর ১৮০ টাকা, বেগুন ৭০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া খুচরা বাজারে প্রতি কেজি শিম ৩২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। সঙ্গে প্রতি কেজি শজনে ১৮০ টাকা, দেশি শসা ১২০-১৬০ টাকা। পাশাপাশি করলা, কাঁকরোল ও ঢ্যারশ প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সঙ্গে দেশি পটোল ১৪০ টাকায় বিক্রি হলেও হাইব্রিড পটোল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৮০-৮৫ টাকা। খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ৭০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, মুলা ৮০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৪০ টাকা ও ধনেপাতার কেজি ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে সঙ্গে বাড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট। চাহিদা মেটাতে সংকটে পড়ে। ঈদ ঘিরে বাজারে সংস্থাগুলো তদারকি জোরদার করায় ভোক্তারা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে ছিল। তবে ঈদের পর তদারকিতে ঢিলেঢালা ভাব থাকায় বিক্রেতারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও নীরবে সব পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে, তদারকি জোরদার করে অসাধুদের আইনের আওতায় আনা।
শুক্রবার খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, এদিন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০-৪৫ টাকায়। প্রতি কেজি দেশি রসুন সর্বোচ্চ ১৪০ ও আমদানি রসুন সর্বোচ্চ ২২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সঙ্গে প্রতি কেজি দেশি হলুদ সর্বোচ্চ ৩০০ ও আমদানি করা হলুদ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। দেশি আদা সর্বোচ্চ ১৫০ ও আমদানি করা আদা ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি মুদি দোকানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৯৫ ও বোতল সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা। প্রতি কেজি মোটা দানার মসুর ডাল ১০৫, মাঝারি দানার মসুর ডাল ১২০ ও সরু দানার মসুর ডাল ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা এক মাস আগেও সরু মসুর ডাল ১৫০ টাকা ছিল। বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ঈদের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জোরালোভাবে বাজার তদারকি করছেন। কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
(যুগান্তর)