সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন




মেসির সামনে এক বিস্ময় বালক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১:৩৮ pm
মেসি Cristiano Ronaldo dos Santos Aveiro Portuguese footballer Portugal national team পর্তুগিজ পর্তুগাল ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ronaldo Argentina Argentine Footballer Lionel Andrés Messi আর্জেন্টিনা তারকা লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা মেসি রোনাল্ডো মেসি-রোনাল্ডো মেসি-রোনাল্ডো মেসি মেসি
file pic

লিওনেল মেসির সামনে কী অপেক্ষা করছে। তার ভাগ্যেই বা কী আছে। তার হাতেই কি পর পর দু’বার বিশ্বকাপের ট্রফি উঠবে? নাকি সেই বিস্ময় বালকের কাছেই যাবে? মেসির সঙ্গে যার বয়সের ফারাক ২০ বছর। প্রশ্নটির উত্তর এই মুহূর্তে নেই। এর ফয়সালা হবে রোববার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। তুমুল উত্তেজনা চারদিকে। দুই তারকার লড়াই দেখার জন্য মুখিয়ে ফুটবল দুনিয়া। একদিকে মেসি, অন্যদিকে ইয়ামাল। অনেকেই এটাকে মহারণও বলছেন। এর অবশ্য নানা কারণ রয়েছে। অনেকটা আবেগও কাজ করছে লড়াইটিকে ঘিরে। ফুটবলের সর্বোচ্চ পুরস্কার জয়ের লড়াই। আর্জেন্টিনা ও স্পেন মুখোমুখি। সব ধরনের প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে দু’দল এপর্যন্ত মোট ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৬ বার, স্পেনও ৬ বার। ড্র দুটোতে। ১৯ বছরের লামিন ইয়ামালের এটাই প্রথম বিশ্বকাপ। লিওনেল মেসির মুখোমুখি হননি তিনি এর আগে কখনো। তবে খেলার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যা ফুটবলভক্তদের মধ্যে অনেক আবেগ ও গল্প তৈরি করেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার সময় ৫ মাস বয়সী ইয়ামালকে মেসি গোসল করাতে সাহায্য করেছিলেন।

ভাবা যায়, মেসির কোলে থাকা ইয়ামাল এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ! সংবাদ সংস্থা এপি’র ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট এই ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন। ছবিগুলো ছিল স্থানীয় পত্রিকা Sport এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য। মেসি তখন বার্সেলোনায়। এই ফটোশুটের জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজিও হন। ভাগ্যের খেলা- ইয়ামালের মা, যিনি ক্যালেন্ডারের ছবিতেও ছিলেন। বার্সেলোনার কাছে মাতারো শহরের পরিবারগুলোর মধ্য আয়োজিত এক লটারিতে তিনি বিজয়ী হন। সেই সুবাদেই এই ফটোশুটে অংশ নেয়ার সুযোগ আসে। ফুটবলের নিয়তি কি এটাই? ১৫ বছর পর এই শিশুটা তারকা হয়ে উঠবেন! আর তার প্রতিপক্ষ হবেন বিশ্ব ফুটবলার মেসি! যিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ইতিমধ্যেই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।

মনফোর্ট বলেছেন, আমি ভাবতেও পারি না একটি সাধারণ ফটোশুট বিশ্ব জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে। ছবিটা আসলে কী ছিল। প্লাস্টিকের বাথটাবে একটি শিশুকে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন তরুণ মেসি। সাবানের ফেনায় লম্বা চুলের লাজুক মেসির হাত ঢেকে গেছে। তিনি হয়তো জানতেন না- ভবিষ্যতের এক মহাতারকাকেই আশীর্বাদ করছেন। প্রতীকী অর্থে সেই ছবিগুলো এখন ভাইরাল। বিশেষ করে রোববারের বিশ্বকাপ ফাইনালকে ঘিরে এই ছবিগুলো এখন আলোচনার তুঙ্গে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফি হচ্ছে বিশ্বকাপ। এই কাপের জন্য লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন একসময় একই ফ্রেমে ধরা পড়া দুই প্রজন্মের দুই তারকা। শুক্রবার স্প্যানিশ ভাষায় মেসি বলেছিলেন, ইয়ামাল এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। আমি তাকে শুভকামনা জানাই। তার বয়স মাত্র ১৯ বছর। সামনে পুরো ভবিষ্যৎ পড়ে আছে। ছবি সম্পর্কেও তিনি বলেন, এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

ওদিকে ইয়ামাল সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, আমি একটু বড় হয়েছি। আর লিও-ও বয়সে কিছুটা এগিয়েছে। আশা করি, তার মুখোমুখি একটি ফাইনালে খেলতে পারবো। বিশেষ করে ফিনালিসিমা যেহেতু অনুষ্ঠিত হতে পারেনি।

ইয়ামাল যেভাবে বার্সেলোনায়
২০২১ সনে বার্সেলোনা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেকেই ক্লাব ছেড়ে চলে যান। লিওনেল মেসিও আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদেছিলেন। এর দুই বছর পরেই ক্লাবটিতে আবির্ভাব ঘটে লামিন ইয়ামালের। ইয়ামালের জন্ম এক মুসলিম পরিবারে। লামিন আরবি শব্দ। বাংলা অর্থ- সৎ ও বিশ্বস্ত। ইয়ামালের অর্থ হচ্ছে সুন্দর ও সৌহার্দ্য। পরিবারটি ছিল অনেকটা আর্থিক সংকটে জর্জরিত। তার বয়স যখন তিন বছর, তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর মাকে নিয়েই এ বাড়ি ও বাড়ি করে বড় হওয়া। মজার ঘটনা হচ্ছে- এই ছবিগুলো তার বাবাই সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন। যা নিয়ে হইচই তামাম দুনিয়ায়। যাইহোক, স্পেন ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন আর আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন। একইসঙ্গে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নও।

স্পেনের বড় বড় শহরের রাস্তায় শিশুদের গায়ে ইয়ামালের ছবি। বার্সেলোনা ও স্পেনের জার্সি। অন্যদিকে মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনায় আলোড়ন। যুক্তরাষ্ট্রেও কম নয়। কারণ মেসি ইন্টার মায়ামির জার্সিকে জনপ্রিয় করেছেন বিশ্বে।

কেমন হবে স্পেন-আর্জেন্টিনা লড়াই? স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল এক অঘটন দিয়ে। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম স্থানে থাকা কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে। যেটা ফুটবল ভক্তদের বিস্মিত করেছিল। অবশ্য পরের ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে ছন্দে ফিরে আসে। এর মধ্যে ইয়ামাল গোল করেন একটি। উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ এইচ-এর শীর্ষস্থান দখল করে। যদিও লড়াইটা ছিল খুব কঠিন। শেষ ৩২-এর ম্যাচে স্পেন অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারায়। শেষ ষোলোতে স্পেনের প্রতিপক্ষ ছিল পর্তুগাল। উত্তেজনাপূর্ণ খেলায় বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর এক গোলে জয় নিশ্চিত হয়। বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও ম্যাচের শেষদিকে মিকেল মেরিনো আবার চমক দেখান। সেমিফাইনালে শিরোপাপ্রত্যাশী ফ্রান্সকে বিদায় করে স্পেন। যা ছিল অনেকটা অবিশ্বাস্য। এখানেও লামিন ইয়ামালের বুদ্ধিদ্বীপ্ত খেলা ও নিরলস প্রচেষ্টায় স্পেন একটি পেনাল্টি আদায় করে। ওদিকে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রায় টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প সবার জানা।

এ কারণে তাদের ফাইনালে পৌঁছার কীর্তি আরও বিস্ময়কর। অনেক সময় তারা শারীরিক ও কৌশলগতভাবে চাপে পড়েছে। সেমিফাইনালে যেভাবে ইংল্যান্ডকে বিদায় করেছে তা এককভাবে মেসির জাদুতেই। গ্রুপপর্ব তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু মেসি ছিলেন দুর্দান্ত। রক্ষণভাগও খুব একটা পরীক্ষার মুখে পড়েনি। অবশ্য কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে তারা বিদায়ের সন্নিকটে পৌঁছে গিয়েছিল। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর জয় তুলে নেয়। সেই ম্যাচটি ছিল বিতর্কিত রেফারিংয়ের কারণে। কোয়ার্টার ফাইনালেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা বিপদে পড়েছিল। খেলার স্কোর যখন ১-১ তখন সুইসরা ম্যাচের গতি তাদের পক্ষে অনেকটা নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এমবোলো লাল কার্ড দেখায় আর্জেন্টিনার ভাগ্য খুলে যায়। সেমিফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা সংকটে পড়ে। মেসির জাদুতেই সংকট কাটিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়।

স্পেনের ফুটবল নিয়ে কিছু বলতেই হয়। তারা ছোট ছোট পাসে খেলে। এই বিশ্বকাপেও তারা সেই কৌশল অনুসরণ করছে। সাত ম্যাচে গড়ে ৬৩.৭ শতাংশ সময় বলের দখল নিজেদের কাছে রেখেছে তারা। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পেনের দক্ষ খেলোয়াড়রা নিখুঁত পাসে বল ঘুরিয়ে খেলতে ভীষণ পারদর্শী। এ কারণেই প্রতিপক্ষকে অনেকটা ছায়ার পেছনে ছুটতে হয়। খেলোয়াড়রা নিয়মিত তাদের স্থান বদল করে। দ্রুত গতিসম্পন্ন স্পেনের প্লেয়াররা দ্রুততার সঙ্গে রক্ষণভাগের কাঠামো ভেঙে দেন।

পেদ্রো পোরো এবং মার্ক কুকুরেয়া ছিলেন প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক। ১৩৯ বার দৌড়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে তছনছ করার চেষ্টা করেছেন কুকুরেয়া। অবশ্য একটা হলুড কার্ডও তাকে দেখতে হয়েছে। আর্জেন্টিনা রয়েছে লড়াকু মানসিকতা নিয়ে। কখনো হার না মানার প্রবণতা। মেসির আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তে জেগে ওঠে। তারা এই টুর্নামেন্টে ১৯টি গোল করেছে। অধিকাংশ গোলই আসে নির্ধারিত সময়ের ৭৫ মিনিটের পর।

আর্জেন্টিনার আক্রমণের বেশির ভাগই তৈরি হয় মাঠের মাঝখান দিয়ে। যেখানে মেসি অবস্থান করেন। সেমিফাইনালে অবশ্য রাইট উইংয়ে খেলেছেন। মেসির অসীম প্রতিভা আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে এসেছে। স্পেনের সঙ্গে খেলায় কিছু পরিবর্তন আনছে আর্জেন্টিনা। আক্রমণের মূল কেন্দ্র মাঝমাঠ হলেও মেসি তা বদলে দিতে পারেন শেষ মুহূর্তে। মেসির নিখুঁত ক্রসের কারণে স্পেনের বিপদ হতে পারে। হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্টিনেজ মেসির দেয়া বলে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন। ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ান প্রতিপক্ষের সামনে। মেসি আর্জেন্টিনার গোলের প্রধান উৎস। মূল কারিগর। অনেক সময় দেখা যায়, মেসি হাঁটাহাঁটি করছেন মাঠে। কেউ হয়তো বলতে পারেন একজন ৩৯ বছর বয়সী ফুটবলার তার হয়তো শারীরিক সামর্থ্য নেই। কিন্তু এই মহাতারকা কৌশল বদলাতে পারেন যেকোনো সময়।

প্রয়োজনের মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যেটা করেছেন। জেনে রাখা ভালো, স্পেন ও আর্জেন্টিনা সম্পর্কের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। ১৬ শতকে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। ইতিহাস বলছে, ফুটবলে দুই পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও তারা মুখোমুখি হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৬৬ সনে যে বছর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ নেয়। গ্রুপ পর্বের ওই খেলার ফল ছিল আর্জেন্টিনা ২, স্পেন ১। বার্সেলোনার সাবেক তারকা মেসি তার ক্যারিয়ারে মাত্র তিনবার স্পেনের বিপক্ষে খেলেছেন। সে সময় স্পেন তাকে জাতীয় দলের হয়ে খেলতে রাজি করাতে চেয়েছিল। কিন্তু মেসি তাতে সাঁয় দেননি। ২০১৮ সনে এক প্রীতি ম্যাচে স্পেন আর্জেন্টিনাকে বিধ্বস্ত করেছিল ৬-১ গোলে। উল্লেখ করা যায় যে, দুই দলের ৫২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৪ জনই স্পেনের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলেন।

রোববারের ম্যাচের ভাগ্য কীভাবে নির্ধারিত হবে। বলাবলি আছে, এর অনেকটা নির্ভর করবে স্পেনের তীব্র চাপ আর্জেন্টিনা কতোটা সামলাতে পারবে তার ওপর। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তারা প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের বক্সে মাত্র তিনবার বল স্পর্শ করতে পেরেছিল। ইংল্যান্ডের মতো স্পেন সহজে রক্ষণাত্মক হবে এমনটা মনে হয় না। কেউ কেউ বলছেন, আর্জেন্টিনার জন্য স্বস্তির বিষয় হবে। তাদের যুক্তি- লামিন ইয়ামালকে বাদ দিলে স্পেনের আক্রমণভাগের খুব বেশি গতি নেই। আর এই গতি না থাকলে আর্জেন্টিনাকে থামানো সহজ হবে না। যদিও পাসের সফলতায় মাত্র এক শতাংশের একটু বেশি এগিয়ে আর্জেন্টিনা। ফাইনালটি এক খণ্ডিত ছন্দের ম্যাচ হতে পারে এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করছেন ফুটবলের সাবেকরা। তারা অবশ্য স্পেনকে এগিয়ে রাখছেন। বলছেন, আর্জেন্টিনা সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। তাদের যুক্তি- স্পেনের রক্ষণভাগ ইতিহাসের সেরা। মানবজমিন




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD