চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সমুদ্র উপকূলকে ঘিরে শিল্প-কলকারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সমুদ্র দেশের সম্পদ। এর মালিক জনগণ। বাঁশখালী থেকে মিরসরাই পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী করা হবে।
রোববার দুপুর ২টার দিকে বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং গৃহহীনদের জন্য নির্মিত ঘরের চাবি হস্তান্তর করা হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে দেখা করে আমি খুশি হয়েছি। আমরা ১০০ জনকে ঘরের চাবি তুলে দিতে পেরেছি। ত্রাণ দিয়ে সহযোগিতা করেছি। এগুলো করার কারণ হচ্ছে—এই সরকারের কাজ তরুণ সমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।’
নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের ৪১ লাখ পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। বাঁশখালী উপজেলায় আগামী অর্থবছরে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কৃষকদের কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। লবণচাষি ভাইদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কিছুদিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাঁশখালীর সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় এলাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সমুদ্র দেশের সম্পদ। এই সমুদ্রের মালিক দেশের জনগণ। বাঁশখালী থেকে শুরু করে মিরসরাই পর্যন্ত কীভাবে কলকারখানা চালু করা যায়, কীভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়—সেই পরিকল্পনা করতে হবে। শিল্পায়নের পাশাপাশি অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করা হবে।’
দেশে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যে ৫০টি শয্যা রয়েছে, তার ৩০টি শয্যা করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ২০টি করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অল্প সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
তারেক রহমান বলেন, জনগণের জীবনমান উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশের প্রত্যেক নাগরিক যাতে প্রয়োজনীয় সুবিধা পান, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও যেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা জরুরি। কেউ যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ‘বিভ্রান্তকারীরা যাতে কোনো সুযোগ না পায়, সে জন্য আমাদের সাবধান থাকতে হবে’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে তারেক রহমান বলেন, বিগত সরকার বিদ্যুৎ খাতকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল। আগামী ১০ বছরের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে কীভাবে পরিকল্পনা করা যায়, তা সংসদে তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন ধরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে কিছু মানুষ জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
দেশে কৃষি ও শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ফসল বিপ্লব ঘটাতে হবে, শিল্প বিপ্লব ঘটাতে হবে। দেশের মানুষ আর বিভ্রান্ত হবে না। এখন দেশ গড়ার সময়।’
জনগণের সহযোগিতা পেলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের জীবনমান উন্নত করা সম্ভব। ‘অতি অল্প সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালে উপস্থিত লোকজন বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘অতি অল্প সময়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হবে।’ উপকূলীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি জানান।
পর্যটন এলাকা ঘোষণার দাবি
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাঁশখালী আসনের বিএনপি দলীয় এমপি প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম বাপ্পা বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় বাঁশখালীর লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে কষ্ট পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বাঁশখালীর সমুদ্রসৈকত সম্পর্কে এখন সারাদেশের মানুষ জানতে পেরেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাঁশখালীকে পর্যটন এলাকা ঘোষণা করা প্রয়োজন। তিনি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লবণচাষিদের জন্য স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন, জলকদর খাল রক্ষা এবং পিএবি সড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি জানান।
মিশকাতুল ইসলাম বাপ্পা বলেন, লবণচাষিদের জন্য সুষ্ঠু নীতিমালা করা হলে তারা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পাবেন। পাশাপাশি জলকদর খাল রক্ষা ও উপকূলীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
‘বাপ্পা যা চেয়েছে, তার চেয়ে বেশি দিলে সমস্যা আছে?’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আজকে প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালীর মানুষকে দেখতে এসেছেন। ভাইপুত বাপ্পা যা বলেছে, তার চেয়ে বেশি দিলে সমস্যা আছে কিনা?’
তিনি বলেন, বাঁশখালী এমনিতেই একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। এখানকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
‘তারেক রহমানের রাজনীতি ভিন্ন ধরনের’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তারেক রহমানের রাজনীতি ভিন্ন ধরনের রাজনীতি। দেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ধারণা রয়েছে।’
তিনি বলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিক যাতে রাষ্ট্রের সুবিধা পান, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং চিকিৎসাসেবার জন্য চিকিৎসা কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বাজেট দেওয়া হয়েছে। দেশের মানুষের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন্তা ও পরিকল্পনা সবচেয়ে বেশি।
আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়জনের হাতে ঘরের চাবি
অনুষ্ঠানে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ১০ জন ব্যক্তির হাতে নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়। এছাড়া গৃহহীনদের জন্য নির্মিত ১০০টি ঘরের মধ্যে ছয়টি ঘরের সুবিধাভোগীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানকে ঘিরে বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাহারছড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় জড়ো হন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম (৯) আসনের এমপি আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের এমপি এনামুল হক এনাম, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের এমপি সরওয়ার জামাল নিজাম, চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনের এমপি জসিম উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম-১৫ (বাঁশখালী) আসনের এমপি জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১৬ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরী, বান্দরবান আসনের এমপি সাচিং প্রু জেরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া, সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের বিএনপি দলীয় এমপি প্রার্থী মোস্তফা আমিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল ইসলাম হোসাইনী ও বাঁশখালী পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক রাসেল ইকবাল মিয়া। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল ইসলাম হোসাইনী ও বাঁশখালী পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক রাসেল ইকবাল মিয়া।