কক্সবাজারে ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। যাকে ‘সোনা মিয়া’ হিসাবে উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কারাগারে থাকা ব্যক্তি দাবি করছেন, তিনি ওই মামলার আসামিই নন। পুলিশি তদন্তেও উঠে এসেছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং ২০২৬ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী এ তথ্য জানিয়েছেন।
আদালতের নির্দেশে পুলিশের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একজনের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে ওই মামলায় তাকেই সোনা মিয়া হিসাবে আসামি করে বিচার চলে এবং পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসাবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে আসামিকে কারাগারে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেফতার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে থাকা সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে সদর থানা পুলিশ। গ্রেফতার সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, তার স্বামী কখনো কোনো মামলায় জড়াননি এবং কারাগারেও যাননি। হঠাৎ র্যাব তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবার একটি মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন, রামুর বাসিন্দা। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। ওই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছিল বলে তারা জানতেন। অথচ এখন সেই মামলায় তার স্বামীকে আসামি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত ও জামিন প্রক্রিয়া নিয়ে। কারণ, তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রেই যখন উল্লেখ করেছিলেন যে সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা সঠিক নয়, তখন কীভাবে ওই পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার চরম গাফিলতি হয়েছে। কোনো ব্যক্তি অন্যের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করা তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
(যুগান্তর)