সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন




সংস্কারে রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না সরকার: দেবপ্রিয়

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ৪:৪৬ pm
cpd Debapriya Bhattacharya economist Centre for Policy Dialogue CPD সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
file pic

সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না বলে মন্তব্য করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ ঘাটতি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন কি না, সেটিও ভাবতে হবে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সিপিডি আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এ কথা বলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সরকারের রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতির বড় উদাহরণ হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার বিষয়টি তুলে ধরেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ছয় মাস হয়ে গেছে, সরকার এখনো বেতন-ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কেন পারছে না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। এর সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও জড়িত। রাজস্ব ঘাটতি যখন এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, তখন এই বিষয়টি ছয় মাস আগেই সরকারের জানা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বেতন কাঠামো নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়ে গেছে। সেটি মূল্যায়ন করে সরকার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবে, আর কতটুকু পারবে না, তা নির্ধারণ করা যেতো। সরকার যদি ধাপে ধাপে বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও মানুষ মেনে নিতো।

‘সরকার এতো দেরি না করে শুরুতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিতে পারতো। এরপর বলতে পারতো, সময় দিন, আমরা বিষয়টি বিবেচনা করছি। কিন্তু এখন বিষয়টি এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে বড় কিছু করা ছাড়া উপায় থাকবে না,’ যোগ করেন তিনি।

তার মতে, গত ১০ বছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি হয়নি। এ বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সচিব যেমন আছেন, তেমনি দারোয়ান-কর্মচারীও রয়েছেন। রাজনৈতিক ও নৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান করতে হবে। যতো দেরি হবে, পরিস্থিতি ততো জটিল হবে। এর প্রভাব সরকারের অন্যান্য কর্মকাণ্ডেও পড়বে।

সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে গিয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো বলেন, সরকারের অনেক ক্ষেত্রে কিছু করার ইচ্ছা আছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তাদের অন্যদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, শক্ত বাস্তবতাকে মোকাবিলায় সরকার কী পদক্ষেপ নেয়। সরকারের হয়তো সদিচ্ছা আছে, কিন্তু সক্ষমতা ও সমন্বয় দেখাতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবের প্রতিফলন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তিনি জানান, সিপিডি সবসময় ‘নির্দয় ভালোবাসা’র কথা বলে এসেছে। সরকারকে সেই অবস্থানে যেতে হবে। জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপগুলো আকর্ষণীয় হলেও কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

সরকারের কর্মকাণ্ডের গতি ও দৃশ্যমান ফলাফল নিয়ে রূপক ব্যবহার করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অনেক ইঙ্গিত দেখি, কিন্তু সংগীত দেখি না। দেয়ার আর লট অব নয়েজেস বাট নো মিউজিক। আমাদের মিউজিকে যেতে হবে।’

অর্থাৎ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও ঘোষণা থাকলেও সেগুলোর সমন্বিত ও কার্যকর ফলাফল আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

সরকার আগামী আড়াই বছর টিকবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় জানান, তিনি এর কোনো বিকল্প দেখছেন না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি উত্তরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই উত্তরণকে গণতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে হবে। ‘আমরা আগাম এসব কথা বলছি সরকারের সাফল্য নিশ্চিত করার জন্য। তারা সফল না হলে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা আমরা দেখি,’ যোগ করেন তিনি।

রাজনৈতিক সাহসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়টি উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে আইন তৈরি হয়, আইন প্রয়োগ হয় ও আইনের নজরদারি হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সরকার দাঁড়াতে দেবে কি না, এটাই বড় প্রশ্ন। পুরোনো সরকারের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানগুলো চলবে কি না, তার চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার রাজনৈতিকীকরণের দিকে নেওয়া হচ্ছে কি না।

তার ভাষ্যে, ‘তারা যদি রাজনৈতিক পদায়ন করেন, তাহলে এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা নিজেরাই।’

তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর রাখতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করা না গেলে অন্যান্য সংস্কারও কার্যকর হবে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বেশি জনপ্রিয় বলেও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে নিজের দলের লোকজনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন কি না এবং আমলাদের যথাযথ জায়গায় রাখতে পারেন কি না, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

তার মতে, যে দেশে প্রতিষ্ঠান দুর্বল, নিয়ম-নীতিতে দুর্বলতা রয়েছে এবং বৈরী বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে দেশ পরিচালনা করতে হয়, সেই দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নেতৃত্বের ক্ষমতা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD