রাজধানীর উত্তরায় বসবাস করেন বেসরকারি একটি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনাম মাহফুজ। সম্প্রতি তার মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নাম ব্যবহার করে একটি এসএমএস আসে। সেখানে বলা হয়, তার গাড়ি নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘন করায় জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বার্তায় উল্লেখ করা হয়। সঙ্গে দেওয়া হয় জরিমানা পরিশোধের একটি লিংক।
আনাম বলেন, ‘আমি মনে করেছি, আমার গাড়িচালক কোনো ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছেন। তাই লিংকে গিয়ে জরিমানার তিন হাজার টাকা পরিশোধ করি। পরে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোন করে জানতে পারি, এসএমএসটি ভুয়া।’
এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে এরই মধ্যে ডিএমপি ও বিআরটিএর পক্ষ থেকে আলাদা সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে সতর্কতার পরও প্রতারক চক্রের তৎপরতা বন্ধ হয়নি। এজন্য এবার বিআরটিএর পরিবর্তে এসএমএস পাঠাতে যাচ্ছে পুলিশ। সঙ্গে সত্যতা যাচাইয়ে থাকবে বেশ কিছু বিষয়। ব্যক্তি চাইলে বিভিন্নভাবে নিশ্চিত হতে পারবেন এসএমএসটি ভুয়া কি না।
রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম চালু হয় কয়েক মাস আগে। এই ব্যবস্থা কেন্দ্র করে বিআরটিএর নামে ভুয়া জরিমানার এসএমএস পাঠিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটে নিয়মিত।
এমন পরিস্থিতিতে প্রতারণা ঠেকাতে এবার এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হওয়া ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় এসএমএস পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।
ডিএমপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসএমএসে থাকবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট গাড়ির নম্বর, অপরাধ সংঘটনের নির্দিষ্ট স্থান, অপরাধের বিবরণ, প্রযোজ্য আইন বা ধারার উল্লেখ, প্রসিকিউশন কোড, জরিমানার পরিমাণ এবং অর্থ পরিশোধের সময়সীমা জানানো হবে। কোনো প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হবে অফিসিয়াল ফোন নম্বরও।
এসএমএসে থাকা লিংকে প্রবেশ করলে মামলার কেস স্লিপ (পিডিএফ ফাইল) ও আইন লঙ্ঘনের ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ দেখা যাবে। ভিডিওটি শুধু দেখার সুযোগ থাকবে, ডাউনলোড বা বাণিজ্যিকভাবে অপব্যবহারের সুযোগ রাখা হবে না।
ফলে কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঘটনার ভিডিও দেখে আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে ধারণা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে মামলার সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা ভুয়া জরিমানার নামে প্রতারণা ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে নতুন ব্যবস্থা চালুর পরও কোনো এসএমএসে পাওয়া লিংক যাচাই না করে সেখানে অর্থ পরিশোধ না করার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা। সন্দেহজনক বার্তা পেলে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগে যোগাযোগ করা অথবা জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে মামলা, ঠিকানা না পেলে ভোগান্তি
ডিএমপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম চার মাসের বেশি অতিক্রম করেছে। বর্তমানে মামলার তথ্য জানাতে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এজন্য বিআরটিএতে যানবাহন নিবন্ধনের সময় দেওয়া ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। ওই ঠিকানায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাওয়া না গেলে নিবন্ধনের সময় দেওয়া মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
তবে অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকা কিংবা পরিবর্তনের কারণে যোগাযোগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধান এবং মামলা-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত জানাতে এসএমএস ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, ‘নতুন এসএমএস সিস্টেম চালুর প্রয়োজনীয় কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা হালনাগাদ করার কাজ চলছে। আগামী মাস থেকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘জরিমানা আদায় বা জরিমানার সংখ্যা বাড়ানো ট্রাফিক পুলিশের মূল লক্ষ্য নয়। নাগরিকরা স্বাভাবিকভাবে আইন মেনে চললে জরিমানা করার প্রয়োজনই হবে না।’
তিন হাজার যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মে ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, পিকআপ, লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। নিয়ম ভাঙার সবচেয়ে বেশি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে।
বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ৪৬টি এআই ক্যামেরা সক্রিয়। পরবর্তীসময়ে এ সংখ্যা ১২০টিতে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এআই ক্যামেরার মাধ্যমে স্টপ লাইন অতিক্রম, নির্ধারিত লেন না মানা, উল্টো পথে চলাচল এবং অন্য ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হচ্ছে। ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য বিশ্লেষণ করে অপরাধ শনাক্ত করা হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে মামলা।
কোন কোন অপরাধে হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় মামলা?
ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এআইভিত্তিক নজরদারির আওতায় লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, লেন পরিবর্তনের নিয়ম ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং ও অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো অপরাধ শনাক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে।
বর্তমানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্যান-টিল্ট-জুম (পিটিজেড) ও নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তির (এনপিআর) ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। পিটিজেড ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে গাড়ির নম্বর ও অপরাধের ধরন শনাক্ত করা হয়। অন্যদিকে, এনপিআর ক্যামেরা সরাসরি গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হচ্ছে। একই সঙ্গে চালকদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রবণতাও বাড়ছে।
শৃঙ্খলা ফেরানোর আশা পুলিশের
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থার মাধ্যমে চালকদের আইন মানতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘এআই ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হওয়ায় প্রতিটি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সরাসরি উপস্থিতির ওপর নির্ভরতা কমছে। এআই ক্যামেরা লাগানোর পরে চালক, যাত্রী ও পথচারীরা নিয়ম মানতে শুরু করেছেন। বর্তমানে প্রায় সব কয়টি ট্রাফিক সিগন্যালে নিয়ম মানতে দেখা যাচ্ছে চালকদের। যারা মানছেন না তাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে মামলা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো আগামী মাস থেকে এআই মামলার তথ্য সংশ্লিষ্টদের মোবাইলে এসএমএসে দিতে পারবো। স্বয়ংক্রিয় এসএমএস ব্যবস্থা চালু হলে সড়কে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা কমে আসবে। এসএমএসের লিংকে থাকবে একটি ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও। এআই ক্যামেরা অন্যায়ভাবে মামলা দিচ্ছে না- এটা প্রমাণের জন্যই ভিডিও দেওয়া হবে।’ জাগো নিউজ