আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলে স্থানীয় বাজারে দ্রুত এর প্রভাব পড়ে। কিন্তু কোনো পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে হ্রাস পেলে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়ে দেরিতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও দেশের বাজারে বৃদ্ধি পায়। বৈশ্বিক মন্দায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছিল।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে ভোক্তার চাহিদা কমানো হয়। পণ্যের দাম কমানোর লক্ষ্যে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে বহু দেশে বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমতে শুরু করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশে এ হার বাড়ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য, ওই সময়ে বাংলাদেশও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেছে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রায় আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশ, মিসর, পাকিস্তান, জাপান, ভিয়েতনাম, আর্জেন্টিনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, মালদ্বীপে এ হার কমেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেশি এমন সব দেশেও এ হার কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অজুহাত দিচ্ছেন, বেশি দামে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করায় এবং দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দামসহ বিভিন্ন সেবার মূল্য ও ফি বাড়ানোয় উৎপাদন খরচ বেড়েছে; এসব কারণে পণ্যের দাম কমানো যাচ্ছে না।
আমরা জানি, দেশে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে পণ্যের দাম ও জাহাজ ভাড়া কমেছে, এর প্রভাব দেশের বাজারে পড়ছে না কেন? ভোক্তারা মনে করেন, বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর অবহেলার কারণেই তাদের দুর্ভোগ ক্রমে বাড়ছে। বস্তুত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে দেশের বাজারের দাম সমন্বয়ের কাজটি কঠিন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমার প্রভাব দেশে না পড়ার মূল কারণ কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব। যেসব পণ্য দেশে উৎপাদন হয়, ভরা মৌসুমে সেসব পণ্যের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিলেই বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর দক্ষতা স্পষ্ট হয়। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাজার তদারকি সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীদের আঁতাতের বিষয়টি বহুল আলোচিত। কাজেই সরষের ভেতরের ভূত তাড়ানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লক্ষ করা যায়, রাজধানীসহ সারা দেশের হাটবাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের পণ্য বেশি দামে বিক্রি হয়। গত কয়েক মাস ধরে মসলাসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পণ্য ও সেবার দাম যাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সেজন্য সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছে মানুষ; সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে সীমিত ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী। এ অবস্থায় কেউ যাতে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ না পায়, কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে।