সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ), তাঁর পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবায়ে কেরামের ওপর।
রমাদান মাস ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত সুযোগ। এই মাসে দিনের রোজার পাশাপাশি রাতের তাহাজ্জুদ সলাতেরও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তারাবিহ সলাতের পর মসজিদগুলো যখন ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা রাতের গভীরে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর জন্য পুনরায় প্রস্তুত হন। রমাদানের শেষ দশকে যখন ইতিকাফ, কিয়ামুল লাইল ও লাইলাতুল কদরের সন্ধানে মানুষ আরও বেশি ইবাদতে মনোনিবেশ করে, তখন একটি বিশেষ ঈমানী দৃশ্য ফুটে ওঠে—পুরুষ ও নারীরা গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে থাকেন।
এই দৃশ্য মু’মিনদের হৃদয়কে প্রশান্তি দেয় এবং মুনাফিকদের অন্তরে বিরক্তি ও শঙ্কা সৃষ্টি করে। এটি প্রমাণ করে যে, উম্মতে মুহাম্মাদির মাঝে এখনো এমন মানুষ আছেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
তাহাজ্জুদের ইবাদতে কষ্ট ও তার পুরস্কার:
কোনো ইবাদাতই সম্পূর্ণ কষ্টমুক্ত নয়। আল্লাহ আমাদের জন্য কিছু কষ্ট রেখেছেন, যা ইবাদাতের অংশ এবং আমাদের পরীক্ষা করার মাধ্যম। সলাত, সিয়াম, হজ, জাকাত—সব কিছুতেই কিছুটা পরিশ্রম রয়েছে। তবে এই কষ্ট কখনোই সাধ্যাতীত নয়। বরং এটি আমাদের জন্য রহমত, যার মাধ্যমে মু’মিন ও মুনাফিকের পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, যে রাতে উঠে সলাত আদায় করে।”
(সুনানে তিরমিজি)
তাহাজ্জুদ সহজ করার উপায়:
যেহেতু রাতের গভীরে জেগে ইবাদাত করা চ্যালেঞ্জের, তাই কিছু উপায় অবলম্বন করলে এটি সহজ হয়ে যায় এবং আনন্দের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। বিশেষত দীর্ঘ কিয়াম, রুকু ও সাজদার কষ্টকে প্রশান্তিতে পরিণত করার কিছু উপায় নিচে উল্লেখ করা হলো—
১. আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মর্যাদা উপলব্ধি করা
তাহাজ্জুদের সময় আমরা সরাসরি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হই। দুনইয়ার কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির সামনে দাঁড়ালে যেমন আমরা বিনয়ী হই, মনোযোগ দিই—তখন আল্লাহ, যিনি সমস্ত কিছুর মালিক, তাঁর সামনে দাঁড়ানোর গুরুত্ব কত বেশি! কিয়ামের কষ্ট অনুভব করলে মনে রাখুন:
“আমি এখন সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি!”
২. কিয়ামতের দীর্ঘ দাঁড়ানো স্মরণ করা:
কিয়ামতের দিন মানুষ “পঞ্চাশ হাজার বছর” সমপরিমাণ সময় দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্মরণ আমাদের দুনইয়ার অল্প সময়ের কিয়ামকে সহজ করে দিতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“মু’মিনদের জন্য কিয়ামতের দীর্ঘ সময় এতটাই সহজ করে দেওয়া হবে, যেন তা ফরজ নামাজের সময়ের মতো মনে হবে।”
(আহমাদ, ইবনে হিব্বান)
৩. তাহাজ্জুদের অনন্য সওয়াবের প্রত্যাশা করা:
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশায় রমজানে রাতের সলাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।”
(সহীহ বুখারি)
আল্লাহ বলেন: “তাদের পিঠ শয্যা থেকে দূরে থাকে (তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে)… ধৈর্যের কারণে তাদেরকে উচ্চ মর্যাদার জান্নাত দান করা হবে।”
(সুরা আস-সাজদা ৩২:১৬-১৭)
৪. দুনইয়াবি পরিশ্রমের সাথে তুলনা করা:
আমরা দুনইয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রম করি—পরীক্ষার হল পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, কষ্টকর ব্যায়াম করা। তাহলে আল্লাহর ইবাদতে কিছুক্ষণ দাঁড়ানো কষ্টকর কেন হবে?
৫. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া:
তারাবীহের পর হালকা ঘুম নিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলে তাহাজ্জুদের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব হবে।
৬. কুরআনের অর্থ বোঝার চেষ্টা করা:
সলাতে যা তিলাওয়াত করা হচ্ছে, তার অর্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। কুরআনের আয়াত হৃদয়ে স্পর্শ করলে তাহাজ্জুদ দীর্ঘ হলেও তা ক্লান্তিকর মনে হবে না।
৭. নির্ধারিত পাঠ্য অংশ আগে থেকে দেখে নেওয়া:
যে অংশটি পড়া হবে, তা আগে থেকে দেখে নিলে মনোযোগ বাড়বে ও আত্মবিশ্বাস আসবে।
৮. খাদ্য গ্রহণে সংযম করা:
অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ অলসতা বাড়ায় এবং ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।
৯. গুনাহ থেকে দূরে থাকা:
গুনাহ হৃদয়কে কঠিন করে তোলে এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে। ইমাম হাসান বসরি (রহ.) বলেন:
“একটি গুনাহ মানুষকে তাহাজ্জুদ থেকে বঞ্চিত করতে পারে।”
১০. দু’আ ও জিকিরের প্রস্তুতি নেওয়া:
দীর্ঘ সাজদায় কিছু মাসনুন দোয়া ও জিকির মুখস্থ করে রাখলে ইবাদাত আরও গভীরতা লাভ করবে।
১১. সালাফে সালেহিনের অনুসরণ করা:
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) রাতভর নামাজ পড়তেন, এমনকি তাঁর পা ফুলে যেত। আয়েশা (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি এমন করেন কেন? আল্লাহ তো আপনার সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন!” তিনি উত্তর দিলেন: “আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?” (সহিহ বুখারি)
রমাদানের শেষ দশকের গুরুত্ব;
রমাদানের এই শেষ দিনগুলো হলো জান্নাত লাভের সুবর্ণ সুযোগ। এই সময় লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে হবে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদাত করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (সহীহ বুখারি)
তিনি আরও বলেছেন,
লাইলাতুল কদরে এই দোয়া বেশি বেশি পড়ো:
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي”
‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।”
শেষ দু’আ:
اللَّهُمَّ بَلِّغْنَا لَيْلَةَ الْقَدْرِ، وَاخْتِمْ لَنَا رَمَضَانَ بِرِضْوَانِكَ، وَاعْتِقْ رِقَابَنَا مِنَ النَّارِ، وَأَحْيِنَا مُسْلِمِينَ، وَتَوَفَّنَا عَلَى الإِيمَانِ।
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে লাইলাতুল কদর দান করুন, রমাদানকে আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে শেষ করুন, আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্ত করুন, মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবন দিন ও ঈমানের উপর মৃত্যু দিন।” আমীন!
IFM desk