সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৭:৫৭ অপরাহ্ন




দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল অর্থবিত্ত, সেই সম্পদ এখন গলার কাঁটা

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬ ১০:৫৬ am
চাঁদাবাজি ঋণ চুরি Anti Corruption Commission acc দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক Dudok টাকা পাচার Per capita income মাথাপিছু আয় Reserves Reserve রিজার্ভ remittance রেমিট্যান্স প্রবাসী আয় ডলার dollar Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা Pagla Mosque পাগলা মসজিদ কোটি টাকা taka taka money laundering illegal process money generated criminal drug trafficking terrorist funding illegally concealing illicit drug trafficking corruption embezzlement gambling converting legitimate source crime jurisdictions আমদানি ওভার ইনভয়েসিং রপ্তানি আন্ডার-ইনভয়েসিং আমদানি-রপ্তানি অবৈধ জাল অর্থ পাচার জিএফআই মানি লন্ডারিং আর্থিক খাত গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিএফআইইউ হুন্ডি অর্থ পাচার taka
file pic

সাবেক পাসপোর্ট কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের কর্মজীবনের শুরুতেই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর দুর্নীতির দায়ে কারাবরণ। শেষে হৃদরোগে আকস্মিক মৃত্যু। এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি একমাত্র পুত্রসন্তানের করুণ মৃত্যুর পর কালোটাকায় গড়া রফিকের অঢেল সম্পত্তি নিয়ে নিকটাত্মীয়সহ তার পরিচিত মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

স্বজন ও সহকর্মীদের অনেকে বলছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে এত বিপুল সম্পদ গড়ে কি লাভ হলো। জীবদ্দশায় নিজেও ভোগ করতে পারেননি। আবার সম্পদ ঘিরে নানা ধরনের টানাপোড়েনের মধ্যেই একমাত্র পুত্রসন্তানের অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটল। পরিবারের সদস্য হিসাবে টিকে থাকা তার দুই কন্যার একজন বিদেশে। অপরজন দেশে থাকলেও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সম্পত্তির একটি বড় অংশই নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২ মে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে রফিকুল ইসলামের ছেলে আল মুক্কাবির ইসলাম অর্ণবের (৩২) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি তার মৃত্যু ঘিরে নানা সন্দেহ ও সংশয় ডালপালা মেলছে। কেউ কেউ বলছেন, সম্পত্তি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধের জেরে অর্ণবকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা অথবা তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছে।

বাবার অঢেল সম্পদ : অর্ণবের বাবা রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। সর্বশেষ তিনি এডিজি (অতিরিক্ত মহাপরিচালক) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি অঢেল অর্থবিত্তের মালিক বনে যান। এর মধ্যে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ৮/এ নম্বর রোডে একটি ফ্ল্যাট, ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট, সেগুনবাগিচায় ইস্টার্ন ড্রিম নামের ভবনে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট, উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট এবং মালিবাগের মীরবাগে ৫ তলা বাড়ি রয়েছে তার। এছাড়া রাজধানীর ডেমরায় নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত রফিকুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের আকবপুরে ১০ একর জমির ওপর বাবার নামে উমেদ আলী ভুঁঞা উচ্চবিদ্যালয় এবং নীলগঞ্জে আড়াই একর জায়গার ওপর নির্মিত রফিকুল ইসলাম কলেজ রয়েছে। তবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কিশোরগঞ্জের খালিয়াজুড়িতে প্রায় একশ একর কৃষিজমি ও খামারবাড়ি, কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ২০ একর জমি, দোতলা বাড়ি এবং কিশোরগঞ্জ শহরে ১০ শতাংশ জমিসহ বিপুল ভূসম্পত্তি রয়েছে।

সূত্র জানায়, বয়স জালিয়াতির জেরে ২০১৬ সালে রফিকুল ইসলাম চাকরি হারান। এরপর দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান। বেশ কয়েক মাস পর জামিনে মুক্তি পেলেও ২০১৭ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। মূলত এরপর থেকেই তার অঢেল সম্পদ কার্যত মালিকানাবিহীন হয়ে পড়ে। সম্পদের দেখভাল নিয়েও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়।

সম্পদ নিয়ে বিরোধ : জীবদ্দশায় রফিকের বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদের একটি বড় অংশ দেখভাল করতেন ছোট ভাই ওসমান গনি। তিনি একসময় পুলিশে এসআই (উপপরিদর্শক) হিসাবে চাকরি করতেন। কিন্তু ডিবি কার্যালয়ে সেই চাঞ্চল্যকর রুবেল হত্যা মামলায় জড়িয়ে তার চাকরি চলে যায়। পরে বেকার হয়ে পড়া ভাইকে নিজের অবৈধ অর্থসম্পদ এবং কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্ব দেন রফিক। এছাড়া জীবদ্দশায় নিজেও এসব সম্পদের দেখভাল করতেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, রফিকের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই ছেলে অর্ণব পৈতৃক সব সম্পদ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে চাচাদের পরিবারসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে চাচা ওসমান গনি, জাহিদ মিয়া ও হারুনের সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দেয়। এমনকি অর্ণবকে তার পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রিতেও বাধা দেওয়া হয়। এসব নিয়ে ভেতরে ভেতরে মানসিকভাবে চরম বিক্ষুব্ধ অবস্থায় দিন পার করছিলেন অর্ণব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্ণবের এক মামা বলেন, অর্ণবের মৃত্যুরহস্য উন্মোচন করতে হলে আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে হবে। বিশেষ করে সম্পদের সূত্র ধরে তদন্ত করলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। কারণ, সম্পত্তির লোভেই হয়তো তাকে সরিয়ে দেওয়ার ফাঁদ পাতা হয়। পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর সাজানো হয় আত্মহত্যার নাটক। আবার এমনও হতে পারে, নানা কৌশলে অর্ণবের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। যাতে সে নিজেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এসব কারণে অর্ণবের মোবাইল ফোন, ব্যাংক লেনদেন, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট প্রভৃতি পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

লাশ উদ্ধারের পর একটি ভবনের সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অর্ণব সম্ভবত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কারণ, মৃত্যুর কিছু সময় আগে তাকে বাড়ির ছাদের একটি সুউচ্চ অংশে একাকী লোহার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা যায়। সেখানে অন্য কেউ তাকে টেনে নিয়ে যায়নি বা আগে থেকে সেখানে কেউ ছিলেন না। এমনকি ঘটনার আগে বা পরে অন্য কাউকে ছাদের ওই অংশে দেখা যায়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অর্ণবের লাশ উদ্ধারের পর তার শোয়ার ঘরের আসবাবসহ ব্যবহৃত জিনিসপত্র পরীক্ষা করা হয়। এ সময় তার কক্ষে মাদকসেবনের বেশকিছু আলামত পাওয়া যায়। সেখান থেকে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার কয়েকটি রিপোর্ট এবং ব্যবহৃত কিছু ওষুধসহ তদন্তের কাজে লাগতে পারে-এমন বেশ কয়েকটি উপকরণ নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়া মৃতদেহ উদ্ধারের সময় তার প্যান্টের পকেটে দুটি ফোনসেট পাওয়া যায়। ওপর থেকে সজোরে নিচের দিকে পড়ায় সেগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কারিগরি সহায়তায় তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার জিসানুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও এ সংক্রান্ত মামলা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়। বিশেষ করে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বা অন্য কোনো কারণে কেউ তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে কি না, সে বিষয়ও ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। রহস্য উন্মোচনের জন্য শিগ্গিরই তার মোবাইল ফোনের ডেটা এবং কললিস্ট পরীক্ষা করা হবে।

তবে অর্ণবের আত্মহত্যার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের অনেকেই মানতে রাজি নন। তাদের প্রশ্ন-সম্পূর্ণ সুস্থ-স্বাভাবিক টগবগে একজন যুবক কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে। এর পেছনে নিশ্চয় অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। বাসায় অর্ণবের সঙ্গে একজন গাড়িচালক এবং দুই গৃহকর্মী থাকতেন। প্রকৃত ঘটনা জানতে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানমন্ডি থানার এসআই (উপপরিদর্শক) রাজিব হাসান বুধবার বলেন, নিহত অর্ণবের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনো পাওয়া যায়নি। রিপোর্ট এলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তার মা এবং দুই বোন এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তাদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD