বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন




পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস

বন্দিবিনিময় চুক্তি মানছে না ভারত

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬ ১০:১০ am
Bangladesh–India বাংলাদেশ-ভারত Bangladesh India বাংলাদেশ ভারত
file pic

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি থাকলেও কার্যত সেটি মানছে না ভারত। দেশটির সরকার মূলত ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট (থ্রি ডি পদ্ধতি) অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। গত কয়েকদিনে বিএসএফের পুশইন অপচেষ্টার কারণে সীমান্ত এলাকায় একাধারে আতঙ্ক ও অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লষকরা ভারতের এমন আচরণকে গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস হিসাবে দেখছেন। তারা বলছেন, বন্দি বিনিময় চুক্তি না মেনে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার উপক্ষো করে সীমান্তে ঘটা করে পুশইনের চেষ্টা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অংশ হতে পারে। ভূরাজনৈতিকভাবে ভারত কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফায়দা লুটতে চাইছে কিনা তা নিয়েও সংশয় আছে তাদের। ইতোমধ্যেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ কোনোভাবেই পুশইন মেনে নেওয়া হবে না জানিয়েছেন। কূটনীতিক শিষ্টাচার ও চুক্তি অনুযায়ী যথায়থ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া শেষে সিদ্ধান্তে আসতে বলেও মন্তব্য করেছেন।

ঢাকা-দিল্লির আগামীর সম্পর্কে তিস্তা চুক্তি, গঙ্গা পানি চুক্তি, বাণিজ্য ভারসাম্য, ভিসা ইস্যু, ইন্দোপ্যাসিফিকের কৌশলগত অবস্থানের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এ অবস্থায় সীমান্তে পুশইনের মতো অস্থিরতা তৈরি করে ভারত অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে দেশের নানা মহলে।

রাশিয়ায় সফররত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, সীমান্তে অবৈধভাবে পুশইন কোনোভাবেই মানা হবে না। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক যত নিয়ম ও আইন আছে তার সবটাই অনুসরণ করবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। ইতোমধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

সূত্র জানায়, ভারতে অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি অবস্থান করলে বা কোনো অপরাধ তার দ্বারা সংঘটিত হলে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য নানা প্রক্রিয়া ও ধাপ আছে। তাকে গ্রেফতার করে বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দেশে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যাবাসন করতে হয়। ভারতের আদালত অবৈধ নাগরিকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে। এরপর দেশটির পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই ব্যক্তির নাম, বংশতালিকা এবং পারিবারিক বিবরণ সংগ্রহ করে। পরবর্তী সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়।

এরপর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসন তদন্ত করে দেখে যে, উক্ত ব্যক্তি আসলেই বাংলাদেশের নাগরিক কিনা। তদন্তে ব্যক্তি বাংলাদেশি প্রমাণিত হলে ভারতে অবহিত হাইকমিশন বা কনস্যুলেট অফিস থেকে তার জন্য স্থায়ী ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করা হয়। নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি ও বিএসএফ এবং স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে একটি নির্ধারিত ল্যান্ডপোর্ট বা সীমান্ত চেক পোস্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এসব কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সীমান্তে পুশইনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দিল্লিকে ১৩ বার চিঠি দিয়েছে ঢাকা। তারপরও থেমে নেই পুশইনের চেষ্টা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেন এভাবে ভারত প্রতিদিন পুশইন করার জন্য শত শত মানুষকে সীমান্তে এনে জড়ো করছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া পুশইনের জন্য আনা সবাই আবার মুসলিম।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে গবেষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ভারত পুশইন করছে সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমরা যা দেখছি না তা হলো এর পেছনে হয়তো কোনো বিশেষ ধরনের উদ্দেশ্য বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা আছে। ভারত হয়তো এর মধ্য দিয়ে তার অন্য কোনো স্বার্থের কথা, ইচ্ছা বা পছন্দের কথা জানাতে চাইছে। সাধারণত কূটনীতিতে যখন বৈঠক হয় তখন অনেক কথা সাবলীলভাবে বলা হয়। আবার অনেক সময় বৈঠক না করেও ভিন্ন স্টাইলে আরেকটা বোঝাতে চায়। এ ঘটনায় মনে হচ্ছে, ভারত ভিন্ন কোনো বার্তা দিচ্ছে। ঢাকাকে কোনো বিশেষ কাজ হয়তো করতে বলছে বা করতে নিষেধ করছে। সেটি হয়তো তাদের মতো করে সরকার রেসপন্স করছে না, সেজন্য পুশইন করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, তবে পুশইন একটি অমানবিক বিষয়। ভারত এর আগেও পুশইন করেছে। আওয়ামী লীগের সময়ে সেটা বন্ধ ছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে আবার পুশইন শুরু করেছে। এটি বিজেপির মুসলিমবিরোধী কর্মসূচি। আগেও ছিল, এখন ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকবে বলে মনে হচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের প্রাক্কালে বাংলাদেশ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে দিতে একটি মহল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তথ্য এসেছে। ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে প্রতিনিয়িত এমন কথাও চাউর আছে।

ব্রি. জে. মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অব.) বলেন, ১৯৯২ সালে ভারত প্রথম পুশইন পরিচালনা করে। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর উভয় দেশের সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘পুশইনকাণ্ড’ দুর্ভাগ্যজনক। বিএনপি সরকার গঙ্গার পানিচুক্তি, তিস্তার পানিবণ্টনসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন ঘটনার আগে দরকষাকষির ক্ষেত্রে চাপ তৈরির জন্য পুশইনের ঘটনা বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, আরেকটি হতে পারে এ বিষয়ে বাংলাদেশের মনোভাব ও সহ্য ক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। যেভাবেই হোক পুশইনে বাধা দিতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে ব্যাপক হারে পুশইন হতে পারে। এর আগে মিয়ানমার সীমান্তে আমাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে। পুশইনের সঙ্গে ভারতের বিজেপি সরকারের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষয়ও জড়িত। এর পেছনে আরও গভীর কোনো বিষয় আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা দরকার, গভীর পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিক প্রবেশ করলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। প্রবেশকারী ব্যক্তি যদি বাংলাদেশি নাগরিক হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে কোনো ধরনের পুশইন হয়নি। প্রতিটি ঘটনা বিজিবি রুখে দিয়েছে।
(যুগান্তর)




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD