মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার। এর প্রতিফলন থাকছে আজ জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাওয়া প্রস্তাবিত বাজেটে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করবেন।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে চিকিৎসা থাকবে সবার নাগালে। যুক্তরাজ্যের জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) মডেলের আদলে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর আওতায় বিনামূল্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ রোগের চিকিৎসা, ওষুধ প্রদান, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবা, নারী স্বাস্থ্যসেবা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের উপযোগী সেবা দেওয়া হবে। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবে একটি মিনি ল্যাব ও ফার্মেসি, যেখান থেকে বিনামূল্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ পাবে। প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটের অধীনে থাকবে তিনটি প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (কমিউনিটি ক্লিনিক)। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবেন তিনজন প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপি’র ১ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী বাজেটে বরাদ্দ দ্বিগুণ হচ্ছে। বাজেটে স্বাস্থ্য খাত কর্মপরিকল্পনায় ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক কার্যক্রমের জন্য ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস শক্তিশালীকরণ ও সম্প্রসারণে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। খুলনাসহ ৪টি জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ কার্ড প্রদান পাইলটিং প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৬২ কোটি টাকা। হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ কোটি টাকা।
ই-হেলথ কার্ড : প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইলেকট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে দেশের যে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসকরা রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের তথ্য দেখতে পারবেন।
জেলায় ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা : জটিল রোগের পূর্ণাঙ্গ, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা প্রাপ্তির লক্ষ্যে প্রতি জেলায় একটি আধুনিক সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের সুযোগ এবং ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও ডিজিটাল রেফারেল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হবে। মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার মূল কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হবে। নতুন করে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ ভাগ হবেন নারী। প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় এনে দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ চালু করা হবে।
ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক : পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওষুধ, স্বল্পমূল্যে ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিসসহ প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ এবং বিনামূল্যে দেশে তৈরি ভ্যাকসিন সরবরাহের মাধ্যমে দুষ্প্রাপ্য ও দামি ওষুধগুলো সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশ অতিক্রম করেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। তবে মানুষ যেন তাৎক্ষণিক সুফল পায় সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। এর সঙ্গে সিস্টেমের পরিবর্তনে জোর দেওয়া উচিত যাতে সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘমেয়াদে উপকার পায়। পাশাপাশি ই-হেলথ কার্ডধারীরা সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেই চিকিৎসাসেবার সব সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমাতে জোর দিতে হবে।
(যুগান্তর)