সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০১:০১ পূর্বাহ্ন




সিজিটিএনের বিশ্লেষণ

তারেক রহমানের চীন সফর, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন মাইলফলক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬ ৮:২২ pm
Tarique Rahman তারেক রহমান Bangladesh Nationalist Party BNP ‎বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি tarek-rahman
file pic

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তিকে আরও কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দিতে চায় বাংলাদেশ ও চীন। এ জন্য উদীয়মান শিল্প, সংযোগ অবকাঠামো (কানেক্টিভিটি) এবং আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদারে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে দুই দেশ। এই প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার দুই দেশ ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গড়ে তুলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও উন্নত পর্যায়ে নেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি চীন সফরে নেয়া এই সিদ্ধান্তকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক আস্থা এবং প্রচলিত ও নতুন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোতে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়েছে।

চীন সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দালিয়ানও সফর করেছেন। সেখানে তিনি ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে, যা ‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিত, অংশ নেন।
এই সম্মেলনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতাকে শুধু প্রচলিত খাতে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং উদীয়মান শিল্প, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহী।

শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে চীন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যেকোনো পরিবর্তনই ঘটুক না কেন, বাংলাদেশ চীনের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবেই থাকবে।

তিনি আরও বলেন, চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং নতুন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রচেষ্টায় সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও মূল্যবান অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চীনের আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য মডেল। তিনি এক-চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন।

দৃঢ ভিত্তির ওপর নতুন অধ্যায়
দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার পেছনে কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হওয়া বাস্তবমুখী সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টানা ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ যোগ দেয়।

গত এক দশকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে অংশ নিয়েছে। এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবারের বৈঠকটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিদ্যমান অর্জনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উদ্ভাবন-নির্ভর ও নতুন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের দিকনির্দেশনা দিয়েছে দুই দেশ।

ভবিষ্যতের জন্য সহযোগিতা সম্প্রসারণ
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বিআরআই বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। পাশাপাশি অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুপরিকল্পিত রূপরেখা প্রণয়নেরও আগ্রহ রয়েছে বেইজিংয়ের। তিনি আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ- চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের কথাও উল্লেখ করেন।
শুক্রবার প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় চীন। একই সঙ্গে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করবে।

বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে প্রস্তুত রয়েছে সরকার। পাশাপাশি মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নসহ বড় যোগাযোগ ও শিল্প প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে উভয় দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া শি জিনপিং সবুজ ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি বছরের সামার দাভোস সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় এসব খাত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ঝাং জিয়াডং বলেন, প্রচলিত ভারী অবকাঠামো প্রকল্পের তুলনায় সবুজ জ্বালানি ও ডিজিটাল অর্থনীতি বাংলাদেশের দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য আরও কার্যকর এবং ব্যয়সাশ্রয়ী পথ হতে পারে।
তিনি বলেন, এসব খাতে চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। বিশেষ করে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেলগুলো কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে তা উল্লেখযোগ্য সহায়তা করতে পারে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও আদান-প্রদান আরও জোরদার হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। শি বলেছেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় কর্মসূচি সম্প্রসারণে আগ্রহী চীন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের আধুনিকায়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে অর্থনীতি ও বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করতে চায় বাংলাদেশ।

গ্লোবাল সাউথের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান
দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় আরও জোরদার করতে প্রস্তুত চীন। সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং সবার জন্য কল্যাণকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি গ্লোবাল সাউথের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় দুই দেশ একযোগে কাজ করবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মানবজাতির জন্য ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ-গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই), গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ (জিসিআই) এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ (জিজিআই)-বিশ্বশান্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সমন্বয় আরও জোরদার করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলাফল এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার প্রতিও বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD