শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ন




আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান-যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার বেশি প্রয়োজন

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬ ৭:১৫ pm
iran-usa-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
file pic

ক্রমবর্ধমান আক্রমণের এক চক্রে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় পক্ষই ঘোষণা করেছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো ও জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি আর কার্যকর নেই। যদিও উভয় পক্ষই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

এদিকে এই আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান উভয় দেশকে হামলা বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, ‘স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নতির জন্য সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।’

প্রকাশ্য বিবৃতিতে উভয় দেশের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা সমঝোতায় আসতে কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার দাবি করেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে আছে ইরান; কিন্তু তেহরান যে চুক্তি মেনে চলবে, সে বিষয়ে তিনি আস্থা রাখেন না।

অন্যদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করছি। তাই আগের শান্তিচুক্তি মেনে চলার কোনো কারণ নেই।’

কিন্তু মাসব্যাপী এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য কি কোনো পক্ষেরই আছে?

ইরানের অবস্থা: দুর্বল অর্থনীতি ও ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক শক্তি

শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণেই নয় বরং দেশটির ওপর কয়েক দশক ধরে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণেও ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। এখনো শক্তিশালী হলেও ইরানের সামরিক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা

ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তেল রপ্তানিকে সংকুচিত করেছে, বৈশ্বিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করেছে এবং সম্পদ জব্দ হয়েছে। এর ফলে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি ২০১২ সালের আট হাজার ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে পাঁচ হাজার ডলারে নেমে আসে। তেল রপ্তানি ২০১২ সালের দৈনিক ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে।

জুনে উভয় পক্ষ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার সময়, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করে, ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। চুক্তির দিন ইরানের রিয়ালের মূল্য ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে, যুক্তরাষ্ট্র এই সপ্তাহে ইরানের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা দেশটির দুর্বল অর্থনীতিতে একটি বড় আঘাত।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে আগ্রাসীভাবে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখলেও, যুদ্ধের প্রথম পর্বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সিএসআইএসের তথ্যমতে, ১ এপ্রিলের মধ্যে ইরান তার যুদ্ধ-পূর্ববর্তী ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ৩০ শতাংশ এবং ড্রোন অস্ত্রের ৬০ শতাংশ শেষ করে ফেলেছে। বন্দর ও নৌযানসহ নৌ অবকাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও হামলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দিয়েছে।

আঞ্চলিক কূটনীতি

মার্চ ও এপ্রিলে ইরানের হামলার কারণে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক এমনিতেই টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। এখন পাল্টা হামলার কারণে তা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ইরান ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে যে তারা মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম পর্বের হামলায় সাধারণ মানুষও নিহত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তা তথ্য আদান-প্রদান করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংকট

ট্রাম্পের বড়াই সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ বেড়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হতো। ইরানের অবরোধের কারণে এই পথে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার, পরে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। মধ্যবর্তী নির্বাচন

তেলের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। এই সপ্তাহে প্রকাশিত ইউগভের জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ মার্কিনি বিশ্বাস করেন, এটি একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই যুদ্ধের প্রভাব রিপাবলিকান দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তারা কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে আছে। কয়েকটি জরিপে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

অস্ত্রের ঘাটতি

সিএসআইএসের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতও কমে আসছে। যদিও এখনো তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল সাতটি যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই সেগুলোর মধ্যে অন্তত চারটির অর্ধেক মজুত শেষ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্ত্রের মজুত আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। যদিও ট্রাম্প সম্প্রতি ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট ব্যবহার করে বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অস্ত্রের পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ১৪ জন সেনাকে হারিয়েছে এবং ১৪ জুলাই পর্যন্ত আহত হয়েছেন ৪১৪ জন।

কোনো পক্ষ কি পিছু হটবে

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহ আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপ থাকলেও দেশটির নেতৃত্ব এই সংঘাতকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখে। তাই তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না।

সালেহ বলেন, ইরানের অর্থনীতি অনেকটাই নিজস্ব উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। গত প্রায় ৪৭ বছর ধরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও দেশটি টিকে থাকার উপায় খুঁজে নিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ইরান নিজেকে দুর্বল হিসেবে পরিচিত করতে চায় না। তাই শুধু সামরিকভাবে কিছুটা দুর্বল পড়লেও তারা কোনো সমঝোতায় রাজি হবে না। অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরান খুব দ্রুত আবার ড্রোন তৈরি শুরু করেছে। কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা, কয়েক মাসের মধ্যেই তারা আগের মতো ড্রোনের মজুত গড়ে তুলতে পারবে।

তার মতে, ‘কাজেই ইরান তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে কোনো চুক্তিতে রাজি হবে না। যতই অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ুক না কেন, ইরান কোনো আপোস করবে না। তাদের কাছে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’

অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত নিয়ে যে উদ্বেগ আছে, তা ইরানের যুদ্ধের কারণে নয়; বরং ভবিষ্যতে চীনের মতো বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতকে ঘিরে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র খুব দ্রুত ব্যবহার হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে কোনো সামরিক সংঘাত হলে এসব অস্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল ও কঠিন।’

সালেহ বলেন, ‘চীন ও রাশিয়া দেখছে যে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও ইরানকে সহজে দমন করতে পারছে না। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের মতো একটি মধ্যম শক্তিকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD