চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফারহানা বেগম দিনাজপুরের তসলিম ইসলামকে ভালোবেসে বিয়ে করেন ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর। নানা টানাপোড়েনের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর তাদের বিচ্ছেদ হয়। বিয়ের দেনমোহর ছিল আট লাখ টাকা। ওই সময় দেনমোহরের প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেননি তসলিম। বিচ্ছেদের প্রায় ছয় মাস পর দেনমোহর, ভরণপোষণসহ ৩৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা দাবি করে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগী ফারহানা। আট বছর ধরে মামলা চললেও দেনমোহরের টাকা বুঝে পাননি।
এদিকে ঢাকার লালবাগের পোস্তা এলাকার ইয়াসমিন সুলতানা ইচ্ছার বিরুদ্ধে পারিবারিক চাপে ২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি চকবাজারের রাহাত হোসেনকে বিয়ে করেন। মেয়ের সুখের আশায় আসবাবসহ যাবতীয় জিনিস দিয়ে ঘর সাজিয়ে দিয়েছিলেন চাকরীজীবী বাবা। বিয়ের সময় দুই লাখ টাকা দেনমোহরের প্রায় ১ লাখ টাকা উসুল দেখানো হয়েছিল। কিছুদিন পর ইয়াসমিনের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন রাহাত। এক পর্যায়ে ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি তাদের বিচ্ছেদ হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি ইয়াসমিন দেনমোহর, ভরণপোষণসহ ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা দাবি করে ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। ইতোমধ্যে তিনটি তারিখ ধার্য হলেও রাহাত একবারও আদালতে হাজির হননি।
ফারহানা বা ইয়াসমিনের মতো হাজার হাজার নারী তাদের দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে বছরের পর বছর ঘুরছেন। তবু তাদের অপেক্ষা ফুরাচ্ছে না।
জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের পারিবারিক বিরোধ আদালতে বর্তমানে ৭৪ হাজার মামলার বিচার চলছে। ঢাকায় ১৪টি পারিবারিক আদালতে সাড়ে ১২ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে চারটি আদালতে বিচারক নেই। এসব মামলার বড় অংশই বিবাহ বিচ্ছেদ, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, নির্যাতন ও দাম্পত্য বিরোধ ঘিরে। তবে এসব মামলার নিষ্পত্তির সংখ্যা খুবই কম। এই দীর্ঘসূত্রতা হাজারো পরিবারকে আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব বেশি পড়ছে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।
ঢাকা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. নাসিরউদ্দিন বলেন, পারিবারিক আদালতে যেসব আবেদন পড়ে, তা নিষ্পত্তি করতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যায়। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হন।
শরিয়ত অনুযায়ী, স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর ওপর ফরজ। বাংলাদেশ পারিবারিক আইনেও স্ত্রীকে দেনমোহর দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।
তবে বিয়ের সময় অনেকেই দেনমোহরের টাকা বাকি রাখেন। বিবাহ বিচ্ছেদের পর অনেক স্বামীই দেনমোহরের টাকা দিতে চান না। দেনমোহরের জন্য নিরুপায় হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন অসহায় নারী। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, দেনমোহর স্ত্রীর অর্জিত আইনি অধিকার এবং স্বামীর ওপর বর্তানো ঋণ। অথচ সমন জারিতে দেরি, অপ্রয়োজনীয় সময় প্রার্থনা, একই বিচারকের ওপর অতিরিক্ত মামলার চাপ এবং ডিক্রি কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেনমোহরের মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকে।
দেনমোহর পরিশোধ কীভাবে
বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার সমিতির নির্বাহী সভাপতি কাজি মাওলানা মো. ইকবাল হোসেন বলেন, স্ত্রীর দেনমোহর পরিশোধ করা যায় দুইভাবে। প্রথমত, শরীয়ত অনুযায়ী মুয়াজ্জল বা তাৎক্ষণিক পুরো টাকা পরিশোধ করে স্ত্রীকে গ্রহণ করতে হবে। তবে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে কম-বেশি টাকা দিয়ে স্বামী সময় নিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী. দেনমোহরানা পরিশোধের তিনটি ধাপ রয়েছে। প্রথমত, নির্ধারিত মোহরানার একাংশ আলোচনা সাপেক্ষে পরিশোধ বা ওয়াশিল দেওয়ার পর বাকি মোহরানা দুইভাগে দেওয়া যাবে। যার একভাগ স্ত্রীর চাওয়ামাত্র স্বামী দিতে বাধ্য থাকবে। বাকি টাকা পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করতে হবে। স্ত্রী স্বেচ্ছায় না করলে তালাক, খুলা বা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে দেনমোহরের দায় বিলুপ্ত হয় না। স্বামী মারা গেলে দেনমোহর তাঁর সম্পত্তির ওপর ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি বণ্টনের আগে তা শোধ করতে হবে।
হাইকোর্টে রুল
বিবাহের সময় ধার্য করা দেনমোহর আদায় পদ্ধতি ও তা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে পরিশোধের নীতিমালা তৈরি করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না– জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি গত ১৩ জুলাই রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার। চার সপ্তাহের মধ্যে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক সচিব, নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার বলেন, দেনমোহর বিবাহিত নারীর ধর্মীয় অধিকার। প্রত্যেক স্বামীর বিয়ের সময় তার স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ করা উচিত। তবে কোনো কারণে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হলে দেনমোহরের টাকার জন্য বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয়। আবার দেনমোহরের টাকার সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির সামঞ্জস্য হয় না। এ কারণে দেনমোহর নিয়ে অপব্যবহার হচ্ছে। দেনমোহরের টাকার মূল্যমানের সামঞ্জস্য করার জন্যই হাইকোর্টে রিট করেছি। সমকাল
(নিরাপত্তার কারণে প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের প্রকৃত নাম উল্লেখ করা হয়নি)