হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও অন্ত্র- শরীরের এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভালো রাখার জন্য খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর উপাদান যোগ জরুরি। এক্ষেত্রে নানান ধরনের বীজ খাওয়ার পরামর্শও দেন পুষ্টিবিদরা।
আকারে ছোট হলেও চিয়া বীজে রয়েছে প্রচুর আঁশ, উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩, আমিষ, খনিজ উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে খাবারের সঙ্গে এটি যোগ করলে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যে মিলবে সুফল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ ক্যারি গ্যাব্রিয়েল এবং ‘জেটিএ ওয়েলনেস’-এর পুষ্টিবিদ ক্যাট গার্সিয়া-বেনসন, শরীরের এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অংশের যত্নে চিয়া বীজকে ভালো পছন্দ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ছোট বীজে বড় পুষ্টিগুণ
মধ্য আমেরিকার মায়া ও অ্যাজটেক জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় হাজার বছর ধরেই ছিল চিয়া বীজ।যা এই সময়েও স্বাস্থ্য সচেতনরা খাদ্য তালিকায় রাখেন। এই তথ্য জানিয়ে পুষ্টিবিদ ক্যারি গ্যাব্রিয়েল রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “দুই টেবিল-চামচ চিয়া বীজে প্রায় ১৩০ ক্যালরি, প্রায় ১০ গ্রাম আঁশ, পাঁচ গ্রাম আমিষ এবং নয় গ্রাম চর্বি থাকে। এছাড়া এতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।”
অর্থাৎ অল্প পরিমাণ চিয়া বীজ থেকেই শরীর, প্রয়োজনীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান পেতে পারে। “তবে চিয়া বীজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হল, এতে থাকা আঁশ ও উদ্ভিজ্জ চর্বি। এই দুই উপাদানই হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ”, বলেন এই পুষ্টিবিদ।
হৃৎপিণ্ডের জন্য যে কারণে ভালো
চিয়া বীজে থাকা চর্বির বড় অংশ হল, ‘আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিড’ বা উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩। এই উপাদান রক্তে কোলেস্টেরলের ভারসাম্য বজায় রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরে প্রদাহ কমাতে ভালো কাজ করে। চিয়া বীজের দ্রবণীয় আঁশও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিপাকতন্ত্রে কোলেস্টেরলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, শরীর থেকে বের হয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে। ফলে রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমার প্রবণতা কমতে পারে।
রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থাকলে ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচলে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নিত্যদিনের খাবারে আঁশযুক্ত খাবার রাখাটা জরুরি। অবশ্য শুধু চিয়া বীজ খেলেই হৃদ্যন্ত্রের সব সমস্যা দূর হবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি খাওয়া ভালো।
অন্ত্রের যত্নেও চিয়া বীজ
খাবার হজম, পুষ্টি শোষণ এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার জন্য চিয়া বীজে থাকা প্রচুর আঁশ কার্যকর। পুষ্টিবিদ ক্যাট গার্সিয়া-বেনসন বলেন, “চিয়া বীজ তরলের সঙ্গে মিশলে জেলির মতো একটি স্তর তৈরি করে। এটি পরিপাকতন্ত্রে পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং মলত্যাগ নিয়মিত রাখতেও সহায়তা করতে পারে।” চিয়া বীজের আঁশ, অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর জন্যও খাবার হিসেবে কাজ করতে পারে। এছাড়া আঁশ হজমের গতি কিছুটা ধীর করে দিতে পারে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। খাবারে আঁশের পরিমাণ কম থাকলে ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় চিয়া বীজের মতো আঁশসমৃদ্ধ খাবার যোগ করা যেতে পারে। তবে হঠাৎ করে বেশি পরিমাণে আঁশ খেলে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই পরিমাণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ধীরে এগোনো ভালো।
মস্তিষ্কের জন্যও পুষ্টিকর
চিয়া বীজের উপকার শুধু অন্ত্র বা হৃৎপিণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। মস্তিষ্কের সুস্থতার ক্ষেত্রেও এতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান উপকার দেয়। চিয়া বীজে থাকা উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর জারণজনিত চাপ থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে। ক্যারি গ্যাব্রিয়েল বলেন, “চিয়া বীজের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজের সঙ্গেও এই প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।”
যেভাবে চিয়া বীজ খাওয়া উপকারী
চিয়া বীজ খাওয়ার সহজ উপায় হল, তরল বা আর্দ্র খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়া। পানি, দুধ, দই, ওটস, ফলের পানীয় বা বিভিন্ন ধরনের পায়েসজাতীয় খাবারের সঙ্গে এটি মেশানো যায়। সালাদ, পাউরুটি বা শস্যজাতীয় খাবারের ওপরও ছড়িয়ে খাওয়া যায়।
ক্যাট গার্সিয়া-বেনসন পরামর্শ দেন, “পানি, ফলের পানীয়, ওটস, দইয়ের সঙ্গে চিয়া বীজ যোগ করা ভালো।” এছাড়া দুধের সঙ্গে পরিমাণ মতো চিয়া বীজ মিশিয়ে সারা রাত ভিজিয়ে রাখার কথাও বলেন তিনি। তবে চিয়া বীজ খাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। শুকনো চিয়া বীজ এক চামচ করে সরাসরি মুখে দিয়ে পরে পানি পান করা ঠিক নয়। কারণ তরলের সংস্পর্শে চিয়া বীজ দ্রুত ফুলে ওঠে। ফলে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যাদের গিলতে সমস্যা রয়েছে, তাদের এ বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
চিয়ার পরেই তিসি বীজ
চিয়া বীজ প্রথম পছন্দ হলেও তিসির বীজও পুষ্টিগুণের দিক থেকে বেশ শক্তিশালী। এতে চিয়া বীজের মতোই আঁশ, উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ এবং অন্যান্য উপকারী পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
তাই যারা চিয়া বীজ খেতে পছন্দ করেন না, তাদের জন্য তিসির বীজও ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে তিসির বীজ গোটা অবস্থায় খাওয়ার চেয়ে গুঁড়া করে খেলে, শরীর এর উপকারী চর্বি ও পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে।